কক্সবাজারের বেশির ভাগ মানব পাচারকারী এখন এলাকায় অবস্থান করছেন। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কেউ জামিনে, কেউ পুলিশের চোখ এড়িয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানব পাচারের একাধিক মামলা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনও পাচারকারীর সাজা না হওয়ায় খোশমেজাজেই দিন কাটাচ্ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফের শীর্ষ মানব পাচারকারী খুইল্যা মিয়া মাঝি, মো. ফিরোজ, আবু তাহের, হেলাল উদ্দিন, ছৈয়দ উল্লাহ, মো. ইসমাইল, আব্দুল হামিদ, আবুল কালাম, নজির আহমদ ওরফে নজির ডাকাত, লম্বা সেলিম, মো. দেলোয়ার, সাইদ কামাল ও জিয়াবুল নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছেন। এছাড়া, আব্দুল আমীন মালয়েশিয়ায় ও মো. হাসিম ওরফে পোয়া মাঝি কক্সবাজার কারাগারে রয়েছেন। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৫ থেকে ১০টি মামলা রয়েছে।
অারও পড়তে পারেন: নাটোরে নির্বাচন কর্মকর্তার হাত-পা কেটে ফেলার হুমকি
একইভাবে উখিয়ার শীর্ষ মানব পাচারকারী ছৈয়দ আলম ওরফে ছৈয়্যা, মোহাম্মদ ছৈয়দ, রুস্তম আলী, আক্তার মিয়া, মাদু, সাগর আলী এলাকায় অবস্থান করছেন। সম্প্রতি মানব পাচারকারী রুস্তম আলীকে ইনানী পুলিশ ফাঁড়ি আটকের পরও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া জেলার বহুল আলোচিত রেভি ম্যাডাম ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে রয়েছেন।
উখিয়ার আরেক আলোচিত মানব পাচারকারী ফয়েজ আহমদ, আবুল কালাম ৩ মাস ধরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে রয়েছেন। তাদের সহযোগী শামসুল আলম সোহাগ, শাহজাহানসহ ৩ জন সম্প্রতি চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারে রয়েছেন। তাদের সিন্ডিকেটের আরেক মানব পাচারকারী ছিদ্দিক আহমদ, বেলাল ওরফে লাল বেলাল বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাদের অনেক সদস্য এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াছেন।
মানব পাচারকারীদের বড় একটি অংশ কীভাবে জামিনে বেরিয়ে এলো জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কক্সবাজারের পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিম বলেন, মামলার দুর্বলতার কারণে কৌশলে মানব পাচারকারীরা আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে যাচ্ছেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বেশির ভাগ মানব পাচারকারী জামিন পেয়েছেন। এক্ষেত্রে পুলিশ ও সরকার পক্ষের আইনজীবীসহ দায়িত্বশীল যারা রয়েছেন তাদের আরও বেশি সতর্ক ও আন্তরিক হতে হবে।
এলাকায় অবস্থানরত মানব পাচারকারীদের বিষয়ে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মজিদ বলেন, মানবপাচার মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত কোনও আসামি এলাকায় অবস্থান করছেন এরকম খবর আমাদের কাছে নেই। যারা এখন এলাকায় তারা প্রত্যেকে জামিনে রয়েছেন। এছাড়াও টেকনাফে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছেন। তাদের কাছেও এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার র্যাব-৭ ইনচার্জ লে. আশিকুর রহমান বলেন, মানব পাচারকারীরা এখন এলাকায় আছে বলে মনে হয় না। আর যারা এলাকায় অবস্থান করছেন তারা প্রত্যেকেই আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। এরপরও যদি কোনও মানব পাচারকারী এলাকায় অবস্থান করছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ সন্ত্রাস এবং অপরাধ দমনে র্যাব সব সময় তৎপর।
অভিযোগ উঠেছে, জেলার মানব পাচারকারীদের একটি বড় অংশ অবস্থান করছেন উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের কোটবাজার, লম্বরীপাড়া, সোনাইছড়ি, সোনারপাড়া ও মনখালীসহ বিভিন্ন এলাকায়। এসব মানব পাচারকারী ইউনিয়নের সোনাইছড়ি বাদামতলী, সোনারপাড়া বাজার ও কোটবাজারে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছেন। কিন্তু উখিয়া থানার পুলিশ তাদের দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আরও পড়তে পারেন: নির্বাচন কমিশন হতাশ-ক্ষুব্ধ!
তবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফেরদৌস আলী চৌধুরী বলেন, ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে চিহ্নিত কিছু মানব পাচারকারীর এলাকায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ সজাগ রয়েছে। আর যারা জামিনে রয়েছেন, তারাও পুলিশের নজরদারিতে আছেন।
জানা গেছে, ২০১০ সালে সর্বপ্রথম টেকনাফ পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সূচনা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে মানবপাচারের প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সর্বশেষ উখিয়া, রামু, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর ও মহেশখালীসহ জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মালয়েশিয়া পাচার হয়ে যায় কয়েক লাখ বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিক।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিককে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে পাচারকারী চক্র।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর আর্ন্তজাতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। তখন সাগরপথে মানবপাচার বন্ধে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। এরপর থেকে এলাকার চিহ্নিত মানব পাচারকারীরা আত্মগোপনে চলে যান।
আরও পড়তে পারেন: ইউএনওকে পিটিয়ে আহত করলেন ছাত্র ও যুবলীগের কর্মীরা
/এমও/এমএসএম /








