জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাসহ সারাদেশে ধারাবাহিকভাবে বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জনসচেতনতা শুরু হলেও এর কোনও ধারাবাহিকতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে প্রতিবাদের অনুরোধ জানানো হলে, কেবল নির্দেশ মানতে মানববন্ধন কর্মসূচির দায়সারা দায়িত্ব পালন করেছে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
একের পর এক জঙ্গি হামলা ও অভিযানের পর বেরিয়ে আসা পরিচয় থেকে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বারবার উঠে আসলে, সেসব প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয় বেশকিছু কর্মসূচি। তবে সেসব কর্মসূচির কিছুই এখন আর ধারাবাহিকভাবে করতে দেখা যাচ্ছে না।
মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদেরকে একবার মানববন্ধনে নেওয়া হয়েছিল। যখন জঙ্গিরা হামলা করছিল তখন। এরপর আর তারা কিছু জানে না। নাম প্রকাশ করলে স্কুলে সমস্যা হবে বলে স্কুলের বাইরে অপেক্ষমান এক অভিভাবক বলেন, স্কুল থেকে তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাচ্চারাতো আমাদের চেয়ে মিস-দের (শিক্ষকদের) কথা বেশি মানে। স্কুলে এসব বিষয়ে নানা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড করলে, সঠিক বিষয়গুলো ওদের জানানো হলে অনেকটা আশ্বস্ত হতে পারতাম।
এদিকে জঙ্গি হামলা, অভিযান ও সন্দেহভাজন হিসেবে বেশ কয়েকজন জঙ্গির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদবিরোধী বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়।সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জঙ্গি সচেতনতা বিষয়ক সভা-সমাবেশ ও মঞ্চ তৈরি করা হয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করা সম্ভব হয়নি। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরতদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এসব নিয়ে কথা বলতে স্বস্তিবোধ করছে না। তাদের মধ্যে একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখনও আমাদের প্রতি নজরদারি আছে। ক্যাম্পাসে এখনও কিছু কার্যক্রম আছে। ফলে আমরা কার সামনে কি বলে বিপদে পড়ি সেই ভয় আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ কর্মকর্তা বেলাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ২৪ বছরের ইতিহাসে আমরা সাকসেস স্টোরি তৈরি করতে গিয়ে, কেবল বিদেশের কতো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফ্যাকাল্টি আনা যায়, তাদের ওয়ার্ল্ড ক্লাস এডুকেশন এখানকার শিক্ষার্থীদের দিয়ে সবার আগে এগিয়ে থাকা, যত দ্রুত শিক্ষার্থী ভর্তি করা যায় সেই চেষ্টা, এগুলোর দিকে নজর দিতে গিয়ে এখন বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়ে গেছি আমরা।তবে আমরা জঙ্গিবাদবিরোধী প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছি বলা যায় এবং আগামী দিনে তা আরও জোরদার হবে।’
এদিকে একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তন’র সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। দৈর্ঘের দিক থেকে সর্ববৃহৎ এ মানববন্ধন থেকে জঙ্গিবাদবিরোধী আহ্বান জানানো হলেও, ক্লাসরুম বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে ধারাবাহিকভাবে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে কোনও উদ্যোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সেদিনই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা কখনও জঙ্গিবাদকে মেনে নেননি, নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মানববন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসূচি শুরু করেছে এবং আগামীতে নীরবে প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিরোধ-প্রতিবাদ চলবে। যদিও গত শনিবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এধরনের কোনও আহ্বানের কথা তারা জানেন না।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, তা ভয়াবহ আকার নিয়েছে গত ত্রিশ বছরে। আমরা বারবারই বলছি, এসব সংগঠন বাংলদেশে জঙ্গি সংগঠনের শেকড়।এদের নিরস্ত করতে হবে।’ শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘যদি আমাদের ছাত্রসমাজকে এই কালো ছায়া থেকে বের করে আনতে হয়, তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের সামনে তুলে ধরার কাজটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। এক-দুইদিন মানববন্ধন করে সে সচেতনতা তৈরি সম্ভব না।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আবদুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুলাইয়ের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যখন বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা শুরু হয়,তখন সরকারও জোরেশোরে জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানায়। কিন্তু সেই আহ্বান কেবল একবারের জন্য মানববন্ধনের না, এটা আমাদের বুঝতে হবে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন জিনিসগুলো অগোচরে ঢুকে যাচ্ছে, তা খেয়াল রাখাটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এ দায় তারা এড়াতে পারবে না।’
/এপিএইচ/







