একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও, এনিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর গৃহীত পদক্ষেপগুলো কেবল মুখে মুখেই সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন স্কুলে নির্যাতনবিরোধী মানববন্ধন করা হলেও, এর মাধ্যমে প্রতিকারের কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না সমাজবিশ্লেষকরা। আর কী কারণেইবা নির্যাতনবিরোধী কথাগুলো কার্যকর রূপ না পেয়ে মুখে মুখে রয়ে গেল, তা নিয়েও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকেই দায়ী করছেন অপরাধবিশ্লেষক ও এসব মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
গত রবিবার টাঙ্গাইলে একটি শিশুকে হত্যার পর চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা করা হয়েছে দুই শতাধিক শিশু। গত সাড়ে চার বছরে হত্যা করা হয়েছে এক হাজার ৩৩২ শিশুকে। সংখ্যা এবং নির্যাতনের নৃশংসতা বেড়ে যাওয়ার পর, কিছু প্রতিবাদের স্বর উঠলেও প্রতিকার না মেলার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘প্রশাসনের অবহেলা আর সিরিয়াসনেসের অভাব’ এর কথা। ফলে জোর করে নির্দেশনা দিয়ে একদিন করে স্কুলে শিশু নির্যতনবিরোধী মানববন্ধন আসলে পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন আনবে না বলেও মনে করেন তারা।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগে বড়রা বড়দের সঙ্গে শত্রুতার বশে শিশুদের খুন করতো, বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতো। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু কিশোরদের হাতে শিশুকে হত্যার ঘটনাও সামনে আসায় বিষয়টি ব্যাখ্যা খুব সহজ বলা যাবে না।
শিশু নির্যাতন বন্ধে জরুরি ব্যবস্থা নিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগমের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়েছিল। বৈঠকের বছর পেরিয়ে গেলেও কিছুই বদলানো সম্ভব হয়নি।বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।পাশাপাশি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এর কোনোটিই দৃশ্যত দেখা যায়নি। সিদ্ধান্ত কেন বাস্তবায়ন হয়নি প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আছে। মানুষের নৃশংসতা নিয়ে নতুন করে গবেষণার দরকার আছে।’ শিশুদের নিরাপত্তায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে প্রশ্নে তিনি প্রকল্পভিত্তিক কিছু উদাহরণ দিলেও, সেটি বর্তমান সহিংসতা থেকে শিশুদের এখনই রক্ষা করছে না।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও শিশুদের নিয়ে আইনি লড়াইয়ে অভ্যস্ত আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুকে শারীরিকভাবে তো নয়ই, মানসিকভাবেও নির্যাতন যেখানে নিষিদ্ধ, সেখানে বিভৎসতা দিন দিন বাড়ছে। আমি মনে করি না এই ক্ষোভ পরিবারের ওপর, এ ক্ষোভ সমাজের ওপর। সেই নির্যাতনকারী যা করতে চেয়েছিল, তা না পারার ব্যর্থতা তাকে হিংস্র করে তুলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এধরনের হতাশা থেকে হিংস্রতা সব সমাজেই ছিল। কিন্তু সেসব পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে সামাজিক পরিসরে ব্যাপক কাজ করে বিষয়গুলো কমিয়ে রাখা হয়েছে। যেটি আমাদের দেশে নেই।’
বিচারিক আদালতের মধ্য দিয়েই এসব ঘটনায় মামলা শুরু হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আইনজীবী শাহেদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে ঘটনা নিয়ে একটু সমালোচনা হয়, সেটির বিচার তাড়াহুড়ো করে শেষ হয়। কিন্তু বিচারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও অভিভাবকদের একটি দিক নির্দেশনা থাকা দরকার। মানুষ সহিংস হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া, সেটার দায় পরিবার থেকে শুরু করে,প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বর্তমান পরিস্থিতি কী ভয়ঙ্কর তা আমরা আন্দাজও করতে পারছি না। প্রতিদিন সংবাদগুলো আসছে, আর আহত হয়ে ভাবছি আবারও এমন খবর! কিন্তু কেন বারবার ঘটছে সেটা নিয়ে আমরা খুব বেশি কাজ শুরু করেছি কি?’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনি লড়াইয়ে আইনজীবীরা ক্লায়েন্ট হারান বা জেতান তাদের মতো করে যুক্তি দিয়ে। কিন্তু সেটার মধ্য দিয়েতো নির্যাতন বন্ধ হওয়ার উদাহরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেবল বিচারহীনতা বলে এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ আমি মনে করি না। সামাজিক বন্ধনগুলো ভেঙে ভেঙে বিচ্ছিন্ন হতে হতে আমরা মানবিকতার জায়গাগুলো হারিয়ে ফেলেছি ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম বলেন, ‘শিশু বিষয়ক কোনও ঘটনা সাধারণত শিশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু শিশু মার্ডার হচ্ছে, হেনস্তা হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িত হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই যে সমন্বয়হীনতা এবং এ ধরনের যথেষ্ট বাজে মানসিকতার কারণেই শিশু নির্যাতনের প্রতিকার হচ্ছে না। আমি শঙ্কিত, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা হয়তো আরও বাড়তেই থাকবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেত গিয়ে অপরাধপ্রবণ মানুষ শিশুর প্রতি সহিংস হয়ে উঠছে।’
ইউআই/এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
ফের আলোচনায় জঙ্গি অর্থায়ন







