সবসময় পরিমিত কথা বলতেন। কারও বিপদ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল তার। সমাজসেবার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই কাজ করতেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। এসব গুণাবলীর কারণেই বন্ধু-স্বজন তো বটেই, প্রতিবেশীদের কাছেও প্রিয়জন হয়েই ছিলেন রফিক জামান। একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশাকেও পছন্দ করতেন সবাই। আর এই দম্পতির একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধ যেন ছিল সবার চোখের আলো। নেপালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনা আরও ৪৮ জনের মতো কেড়ে নিয়েছে এই তিন তাজা প্রাণ। বন্ধু-স্বজন-প্রতিবেশীরা তাই শোকে মূহ্যমান। তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, রফিককে আর তারা পাশে পাবেন না কোনও বিপদের দিনে।
রফিক-সানজিদা দম্পতির বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন রফিক জামান। তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা কাজ করতেন হাঙ্গার প্রজেক্ট নামের একটি এনজিওতে। তাদের ছয় বছর বছরের সন্তান অনিরুদ্ধ প্রথম শ্রেণিতে পড়ত ধানমন্ডির অরণি স্কুলে। সোমবার (১২ মার্চ) ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সে নেপালের পথে রওনা দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত হলে নিহত হন তারা তিন জনই।
রফিক জামানের বন্ধুরা জানান, সানজিদা উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন না। যতটা সম্ভব উড়োজাহাজে যাত্রা এড়িয়ে চলতেন তিনি। কাজের সুবাদে ঘুরে বেড়ানোর সময়-সুযোগ হয় না বলে পারিবারিক ভ্রমণের জন্য নেপাল যাচ্ছিলেন তারা। আর এই ভ্রমণের জন্য তারা বেছে নেন উড়োজাহাজকেই।
রফিক জামানের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী রফিকুল্লাহ রোমেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অমায়িক একজন মানুষ ছিলেন রফিক জামান রিমু ভাই। তাকে খুব সম্মান করতাম। সবসময় তার কাছ থেকে পরামর্শ পেয়ে এসেছি আমরা।’
রফিকুল্লাহ রোমেল আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন রফিক ভাই। আমিও তার সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন সংগঠনের একজন তাত্ত্বিক গুরু। ওই সময় সানজিদা হক বিপাশা আপাও এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতেন। পরে তারা বিয়ে করেন।’ তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে মুহিদ স্যারের একটি বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কাজই রফিক ভাই করেছিলেন।’
নেপালে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই রফিক জামানের শুক্রবাদের বাড়ি এখন শোকস্তব্ধ। ওই ফ্লাইটে রফিক-সানজিদা দম্পতি রয়েছেন— এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবাদ এলাকাজুড়েই নেমে আসে শোকের ছায়া।
মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) শুক্রাবাদ ৮১ নম্বর বাসায় গেলে পরিবারের বরাত দিয়ে প্রতিবেশী মো. সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আমরা শুনেছি যে তাদের তিন জনেরই মৃত্যু হয়েছে। তবে তাদের মরদেহ শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবারের কেউই আশা ছাড়ছেন না।’
সেলিম জানান, রফিক জামানের স্বজনদের মধ্য থেকে তিন জন মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে নেপাল গিয়েছেন। তবে এখনও কোনও খবর তারা জানাতে পারেননি।
প্রতিবেশীরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর শুক্রাবাদে জমি কিনে বাড়ি করেন রফিক জামানের বাবা ইঞ্জিনিয়ার হাজী জহিরুল ইসলাম। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে নিহত রফিক জামান তৃতীয় সন্তান। চার বছর আগে জহিরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। তারপর থেকে বাড়ির তৃতীয় তলায় মা রওশন আরার সঙ্গেই পরিবার নিয়ে থাকতেন রফিক জামান।
রফিক জামানের বড় ভাই রাজু সপরিবারে কানাডায় বসবাস করেন। মেজ বোন ঝুমা থাকেন ওই বাসার চতুর্থ তলায়। আর ছোট বোন রিতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। রফিক জামানের দাদাবাড়ি নোয়াখালীতে। তবে তাদের সব ভাই-বোনের বেড়ে ওঠা শুক্রাবাদেই।
এলাকাবাসীরা বলছেন, রফিক জামানের পরিবারের সবাই সজ্জন। প্রতিবেশী কারও সঙ্গেই তাদের কোনও দ্বন্দ্ব বা ঝামেলা নেই। বরং যেকোনও সময় অন্যদের বিপদে এগিয়েই এসেছেন রফিক জামান। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে তাদের তিন জনের মৃত্যুকে তাই কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রফিক জামানের প্রতিবেশীরা।
এদিকে, একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা নাজিয়া আফরিন চৌধুরী। মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) দুপুরে তার বড় বোনের বাড়ি ধানমন্ডির সোবাহান বাগের ৮/এ-১০ ঠিকানায় গেলেও সেখানে এ বিষয়ে কেউ কথা বলেননি।
তবে ওই বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী রাশেদ বলেন, রবিবার (১১ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে নাজিয়া আফরিন চৌধুরী এসেছিলেন। পরে আমরা জানতে পারি, ওই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মারা গেছেন। তার মরদেহ শনাক্তের জন্য পরিবারের সদস্যরা নেপালে গিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন-
তদন্তের কেন্দ্রে উড়োজাহাজের ব্ল্যাকবক্স
নেপালের হতভাগ্য ১১ মেডিক্যাল শিক্ষার্থী!
পাইলট আবিদ সুলতানের স্ত্রী আফসানা বাকরুদ্ধ
বিমান বিধ্বস্ত: হতাহত বাংলাদেশিদের নাম প্রকাশ
শশীর যে ছবি এখন বাবা-মায়ের কাছে শেষ স্মৃতি
বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা হতে পারে
লাশ স্বাভাবিকভাবে শনাক্ত না হলে ডিএনএ টেস্ট: ড. প্রমোদ শ্রেষ্ঠা (ভিডিও)
নেপালের ৬ কর্মকর্তাকে সরিয়ে নেওয়া সন্দেহের চোখে দেখছে ইউএস বাংলা
এয়ারফোর্সের বিমান প্রস্তুত, লাশ দেশে পাঠানো হবে দ্রুত: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত








