একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে এক মাস আগে। তবে এখনও অফিস গোছানো শেষ করতে পারেননি অনেক মন্ত্রী। কেউ কেউ নতুন করে অফিস ঢেলে সাজাচ্ছেন। কিছু কর্মকর্তার কক্ষেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন।
এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পরও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ করতে গিয়ে দিনের বেশ কিছু সময় পার করতে হচ্ছে মন্ত্রীদের। তারা বলছেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে কারও আবদার, অনুরোধ বা শুভেচ্ছা জানানোকে তো আর এড়িয়ে যেতে পারি না।
জানা গেছে, পুরনো মন্ত্রীদের বেশিরভাগই নিজ দফতরে কোনও পরিবর্তন আনছেন না। আগের অফিসেই বসছেন। তাদের নিজস্ব কর্মকর্তাদের দফতরেও কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে পুরনোদের মধ্যে যাদের দফতর বদল হয়েছে বা প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হয়েছেন, এমন একাধিক মন্ত্রীর দফতর নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এসব মন্ত্রীর দাবি, নিজস্ব কিছু কর্মকর্তার কক্ষ পরিবর্তন করতে হচ্ছে কাজকে সহজ ও গতিশীল করতে।
এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। নতুনদের মধ্যে অনেকেই এসবের দিকে নজর না দিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এরইমধ্যে কোনও কোনও মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড দেশব্যাপী ব্যাপক সারা জাগিয়েছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনে অবস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, দিনরাত কিছু শ্রমিক কাজ করছেন। মন্ত্রীর দফতরের বিভিন্ন কক্ষ-বারান্দার সংস্কার ও ডিজাইন পরিবর্তনের কাজ করছেন তারা। কোথাও কোথাও দেখা গেছে, ফ্লোরের টাইলস ও রং পরিবর্তন করা হচ্ছে। দেয়ালে কাঠের কাজ করা হচ্ছে। ইন্টেরিয়র ডিজাইন পাল্টানো হচ্ছে। আবার কোনও কোনও মন্ত্রী তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের কক্ষও পরিবর্তন করছেন। ফলে মন্ত্রীর পুরো দফতর অগোছালো অবস্থায় থাকতে দেখা গেছে।
একইভাবে সচিবালয়ের প্রবেশ পথে, অভ্যর্থনা কক্ষে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর কক্ষের সামনে অথবা মন্ত্রীর অতিথি কক্ষে অনেক দর্শনার্থীকে ফুল বা ফুলের তোড়া হাতে অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। গত এক মাসেও মন্ত্রীদের এই শুভেচ্ছা গ্রহণ শেষ হয়ে ওঠেনি। শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই মন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন, আবার কেউ মন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকার ভোটার বা জনপ্রতিনিধি, আবার কেউবা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত সংস্থার কর্মকর্তা।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় আওয়ামী লীগ। এরপর গত ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদ শপথ গ্রহণ করে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম— এরা সবাই আগের দফতরেই অফিস করছেন। নতুনদের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, জনপ্রশাসাশন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও কোনও পরিবর্তন না এনে আগের মন্ত্রীর দফতরেই অফিস করছেন।
বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন গত সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। তিনি গত পাঁচ বছর অফিস করেছেন শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত পরিকল্পনা কমিশনে। সেখানেই তিনি তার মন্ত্রণালয় এবং পুরো ক্যাম্পাস সাজিয়েছেন নিজের মতো করে। সেখানেই তিনি কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তিনি সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় শেরেবাংলা নগরে অফিস করছেন। ফলে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর দফতরে তিনি খুব বেশি সময় দিতে পারছেন না।
সচিবালয়ের অর্থমন্ত্রীর দফতরকেও সাজানো হচ্ছে মন্ত্রীর পছন্দ মতো। অর্থমন্ত্রীর দফতরে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ কক্ষেরও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এখানে মন্ত্রীর পিএস, এপিএস, পিআরও ছাড়াও যারা মন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত, তাদের দফতর মন্ত্রীর দফতর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায়, তাদেরকে মন্ত্রীর কাছাকাছি কক্ষে আনা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গত সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এবার তিনিও তার দফতর নিজের মতো করে সাজাচ্ছেন। অনেক কর্মকর্তার দফতর পরিবর্তন করা হয়েছে। তাদের ও নতুন দফতর সাজাচ্ছেন। এখানকার পুরো দফতরের ডিজাইনেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন সরকারের নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও নিজের দফতরে পরিবর্তন আনছেন। এছাড়া, মন্ত্রণালয়ের সামনের বারান্দার ডিজাইনেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সেখানে কাজ করছেন কাঠমিস্ত্রিরা।
নতুন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ.ম. রেজাউল করিম মন্ত্রী হিসেবে যোগদানের পর তার দফতরের সাজসজ্জায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তবে মন্ত্রী হিসেবে যোগদানের আগেই বদল করা হয়েছে তার দফতরের বারান্দার টাইলস। মন্ত্রীর রুমের কিছু আসবাবপত্র পরিবর্তন করা হয়েছে।
নতুন সরকারে পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন আগের সরকারের পরিকল্পনা ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। যেহেতু আগের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আগের দফতরকেই অর্থমন্ত্রীর দফতর হিসেবে ব্যবহার করছেন, সেহেতু নতুন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের জন্য পৃথকভাবে দফতর বানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দফতর সাজানো আমার বিষয় নয়। এটি মন্ত্রীদের নিজস্ব এখতিয়ার। এখানে আমার কোনও কাজ নাই।’
জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে অনেকেই আমাদের শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন। এটাই নিয়ম।’
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দফতর সাজানোর প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটিকে পরিবর্তন বলা ঠিক নয়। মন্ত্রণালয়ের সামান্য কিছু সংস্কার কাজ করা হচ্ছে।’








