‘মুসলিম বাংলার’ ধূম্রজাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর হুঁশিয়ারি

উদিসা ইসলাম
০২ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:০০আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২১, ১০:০৩

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ১৯৭৩ সালের ২ জানুয়ারির ঘটনা।)

১৯৭৩ সালের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বরিশালে সফরে যান। সেখানে তিনি দুটি জনসভায় ভাষণ  দেন। দুই জায়গাতেই তিনি সেই সব মানুষদের কাছ থেকে জনগণকে সতর্ক করে দেন, যারা দেশকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিতে নানা ষড়যন্ত্র করছে।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মাটিতে আর কখনও সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে দেওয়া হবে না। যে কোনও মূল্যে সাম্প্রদায়িকতা উৎখাত করা হবে।’ ১৯৭৩ সালের ২ জানুয়ারি বরিশালের বেল পার্কে আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু এ কথা বলে। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, তিনি যদি জানতে পারেন, বাংলার জনগণ তাঁকে  পছন্দ করে না বা ভালোবাসে না, তাহলে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেবেন এবং একদিনও ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবেন না। তিনি বলেন,  ‘জনগণের ভালবাসাকেই তিনি মূলমন্ত্র বলে জ্ঞান করেন, পদ বা ক্ষমতাকে নয়। তিনি রাজনীতি করেছেন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য নয়, কষ্ট করার জন্য। বাংলার লাখো দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো ও তাদের সমৃদ্ধশালী করতেই তিনি রাজনীতি করছেন।’

মুসলিম বাংলার ধূম্রজাল সম্পর্কে হুঁশিয়ারি

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিরোজপুরে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় বলেন যে, আসন্ন নির্বাচনকে বানচাল করার উদ্দেশ্যে কয়েকটি মহল দেশে গোলযোগ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে।’ প্রধানমন্ত্রী তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য এবং তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী জনসাধারণকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘‘একটি মহল ‘মুসলিম বাংলা’র ধূম্রজাল সৃষ্টি করে দেশে সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বালাবার জন্য সচেষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তারা আজেবাজে ইশতেহার ও প্রচারপত্র ছড়াচ্ছে।’’ এসব দুষ্কৃতিকারীদের পাকিস্তানের এজেন্ট উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তানে নারী নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা এদেশের মানুষ ভুলতে পারবে না।’

৭ মার্চেই নির্বাচন

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘৭ মার্চে নির্বাচন হবে। কিছু দুষ্কৃতিকারী নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ সত্তরের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চাইলে আমি পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারতাম।’  কিন্তু প্রধানমন্ত্রীত্ব তার কাছে কিছুই নয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করার সময়ের উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মানুষকে আবারও সুখী দেখতে চান তিনি।’ ভাষণে তিনি বলেন, ‘এক শ্রেণির লোক কষ্টার্জিত স্বাধীনতা বানচাল করে বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার সুফল থেকে বঞ্চিত করতে চায়। স্বাধীনতা অর্জনের মতো স্বাধীনতা রক্ষা করাও কঠিন কাজ।  সরকার এসব লোকদের ওপরে কড়া নজর রাখছে।’

দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩

আল্লাহ ছাড়া কারোর কাছে মাথা নত নয়

বঙ্গবন্ধু বরিশালের জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, ‘কয়েকটি মহল বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সব পাকিস্তানি এজেন্টের নির্মূল করতে তিনি বরিশালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আহ্বান জানান।’ তিনি বলেন, ‘বাংলার মাটিতে পাকিস্তানের ধারণা সমাহিত হয়েছে।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শেখ মুজিব আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করতে জানে না। আমার দেশের মানুষের খাদ্য নাই, বস্ত্র নাই, দুঃখ-দুর্দশার শেষ নেই। তা সত্ত্বেও কারও কাছে মাথা নত করবো না।’ পাকিস্তানের স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমাদের স্বীকৃতি দিলো কিনা, সে নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই, বরং পাখতুনিস্তান ও  সিন্ধুস্তানকে আমরা স্বীকৃতি দেবো কিনা সেটা ভেবে দেখা হচ্ছে।’

দৈনিক বাংলা, ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩ কাউকে দেশের স্বাধীনতা নসাৎ করতে দেওয়া হবে না

জনসভায় উপস্থিত জনতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ইয়াহিয়া খান তাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তা তিনি পদাঘাত করে বাংলার জনগণের জন্য কারাবরণ করেছিলেন। তিনি জানেন, বাংলার মানুষ বারবার তাদের জীবন বাজি রেখে তাঁকে কারাগার থেকে ছিনিয়ে আনবে।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কিছু মানুষ দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সমালোচনা করছে। সারা বিশ্বের কাছে তাঁকে অপদস্থ করা এবং বিদেশি সাহায্য নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাওয়া ঠেকানোই তাদের মতলব।’ এ সব কুচক্রী বিরোধীদের সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু জনগণের কাছে প্রশ্ন করেন— ‘এই কুচক্রীরা দেশের দুঃসময়ে, দুর্দিনে কোথায় ছিলেন। তারা ভোটের ছালা (বস্তা) হাতে নিয়ে হাজির হয়েছেন, আজ তারা গদি চান।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাদের বৈরী সমালোচনা কোনও কাজে পৌঁছাবে না, বরং তাদের উচিত জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে দেশ পুনর্গঠনে সহায়তা করা।’

দি বাংলাদেশ অবজারভার, ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩ এইদিনে হরতাল ছিল

ঢাকায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে ভিয়েতনামে মার্কিন বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত ছাত্র বিক্ষোভ ও মিছিলের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এই দিনে রাজধানীতে পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। বেলা দুইটা পর্যন্ত ঢাকা শহরের রাজপথে কোনও প্রকার যানবাহন চলাচল করেনি। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদপত্রের গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল।

 

 



/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
মুজিববর্ষ উদযাপনে ব্যয় ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ টাকা: সংসদে অর্থমন্ত্রী
মুজিব বর্ষ উদযাপনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগের খরচ ১২৬১ কোটি
ভূমিহীনমুক্ত হচ্ছে সাতক্ষীরার ৬ উপজেলা, প্রস্তুত ৩৬৪টি ঘর
সর্বশেষ খবর
ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ
ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যানার টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শিক্ষার্থীর মৃত্যু 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যানার টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শিক্ষার্থীর মৃত্যু 
বাংলাদেশের বরখাস্ত কোচ চাকরি পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবে
বাংলাদেশের বরখাস্ত কোচ চাকরি পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবে
রাষ্ট্রপতির এপিএস হলেন তৈমোর হোসেন খান
রাষ্ট্রপতির এপিএস হলেন তৈমোর হোসেন খান
সর্বাধিক পঠিত
কাঁচপুর-ইলিশা সরাসরি ফেরি উদ্বোধন আজ
কাঁচপুর-ইলিশা সরাসরি ফেরি উদ্বোধন আজ
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
কার্গো থেকে সরানো হলো বিমানের সেই কর্মকর্তা লোটাসকে
কার্গো থেকে সরানো হলো বিমানের সেই কর্মকর্তা লোটাসকে
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার