খাদ্যদূষণ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার উদ্বেগ, সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৭আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৭

খাদ্যদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংকট মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

রবিবার (৭ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। খাদ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি ও এর প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যক্রম গ্রহণ এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে খাদ্যবাহিত রোগ, দূষণ সম্পর্কিত ঝুঁকি এবং এ সংকট মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, খাদ্যে বিভিন্ন দূষণের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা জানি; এটাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেই ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে। আমাদের সন্তান, বাবা-মা, আপনজন সবাই এর ভুক্তভোগী। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। বাস্তবায়নের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো কোনটি এখনই শুরু করা জরুরি। এ বিষয়ে জরুরি উদ্যোগগুলো আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নেবো।

এ সময় সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খাদ্যে দূষণ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা লিখিত আকারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

বৈঠকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য, উপাত্ত তুলে ধরা হয়। তারা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী বছরে খাদ্যবাহিত রোগে প্রতি বছর ১০ জনের মধ্যে একজন শিশু বছরে অন্তত একবার অসুস্থ হয়। খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত তিন ভাগের এক ভাগ শিশু মৃত্যুবরণ করে। খাদ্যবাহিত রোগে প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ কোটি এবং বাংলাদেশে ৩ কোটি শিশু আক্রান্ত হয়।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, খাবারে চার ধরনের দূষণ থাকতে পারে। যেমন-ভারী ধাতু, কীটনাশক-জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা ও জৈবদূষক। গত অর্থবছর ১ হাজার ৭১৩টি এবং এ বছর এ পর্যন্ত ৮১৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত মাত্রায় পাওয়া গেছে সীসা/সীসা ক্রোমেট। মোট ১৮০ নমুনার মধ্যে ২২টিতে সীসা শনাক্ত হয়েছে। 

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএমইএ সুইডেনের যৌথ গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৮৭টি পানি ও ২৩ মাছ এর নমুনা সংগ্রহ করে ৩০০ ধরনের ওষুধ, ২০০ ধরনের কীটনাশক, ১৬ ধরনের পিএফএএস শনাক্ত করা হয়।

ইউনিসেফের এক জরিপে জানা গেছে, বাংলাদেশে সাড়ে ৩ কোটি শিশু সীসার সংক্রমণে আক্রান্ত। এ তথ্য তুলে ধরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, সীসা মানবদেহে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি, হাড় ও দাঁতে জমা হয়। শিশুদের হাড় নরম হওয়ায় সীসা সরাসরি মস্তিস্কে চলে যায়। ফলে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

এছাড়া গবেষণায় পাঁচ শতাংশ গর্ভবতী নারীর মধ্যেও সীসার সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। সীসার সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান জানান, বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাব আছে। শিক্ষার্থীদের এ ধরনের পরীক্ষা করার ক্যাপাসিটিও রয়েছে। খাদ্যে সীসার পরিমাণ নিয়ে একটি সমন্বিত গবেষণা করে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। 

বৈঠকে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হাঁস-মুরগি, দুগ্ধজাত খাদ্য ও মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশকারী ক্ষতিকারক পদার্থ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। তারা জানান, হাঁস-মুরগির খামারগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ প্রয়োগ হয়। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে তা ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। ২৮ দিন পার হওয়ার আগেই মুরগিকে বাজারজাত করা হলে সেই মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকতে পারে।

তারা জানান, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন হলেও কিছু চোরাগোপ্তা কোম্পানি কর্তৃপক্ষের নজরদারি এড়িয়ে গোপনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পোল্ট্রি ফার্ম পরিচালনা করছে। 

পোল্ট্রি ফার্মগুলোকে নজরদারিতে আনা এবং কৃষিতে অবৈধ কীটনাশকের ব্যবহার রোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে কখনও কখনও যা খাচ্ছি তা নিরাপদ কিনা সে দিকটি উপেক্ষা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা একটি জরুরি বিষয়। পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

বৈঠকে আরও ছিলেন– কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) চেয়ারম্যান জাকারিয়া ও পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মো. মজিবুর রহমান।

/এসও/আরকে/
সম্পর্কিত
খাদ্য নিরাপত্তায় ১৩২টি উদ্ভাবন প্রকাশ করলো চীন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
আলোচনায় কিচেন কেবিনেট, কারা ছিলেন?
সর্বশেষ খবর
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম