কেন জাতীয় গণমাধ্যম ও সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশে আপত্তি? 

শফিকুল ইসলাম 
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০০ আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০০

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে গণমাধ্যম ও তথ্য প্রবাহের জগতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পাশ কাটিয়ে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন’ নামে দুটি পৃথক কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এই পদক্ষেপকে মুক্ত গণমাধ্যম বিকাশের অন্তরায় এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিক অধিকার কর্মীরা। 

খসড়ায় কী আছে ও কেন বিতর্ক?

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ ও ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে। অধ্যাদেশের মূল বিষয়বস্তু ও বিতর্কের কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো— 

কমিশনের গঠন ও কাঠামো  

সদস্য বিন্যাস: খসড়ার ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এটি হবে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। একজন চেয়ারম্যান ও ৮ জন সদস্যসহ মোট ৯ সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। এর মধ্যে ন্যূনতম একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃ-গোষ্ঠী প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক। 

বাছাই কমিটি (সার্চ কমিটি): ধারা ৭ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ৫ সদস্যের সার্চ কমিটি চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের সুপারিশ করবে। কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত অধ্যাপক এবং ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুইজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক থাকবেন।

দায়িত্ব ও কার্যপরিধি (ধারা ১২) 

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ সমুন্নত রেখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকদের তথ্যের উৎস গোপন রাখার অধিকার নিশ্চিত করা (আদালতের নির্দেশ ছাড়া)। অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার নির্দেশিকা প্রণয়ন। সাংবাদিকদের যোগাযোগ প্রযুক্তি (মোবাইল, ইমেইল) নজরদারি বা হ্যাক করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান। নিয়োগ শর্ত, ন্যায্য সম্মানী এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে পদক্ষেপ নেওয়া।

বিরোধ নিষ্পত্তি ও শাস্তি (ধারা ১৩) 

কমিশনকে বিরোধ নিষ্পত্তি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ক্ষতিপূরণসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন। 

আর্থিক ব্যবস্থাপনা 

অধ্যাদেশে কমিশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কমিশনের নিজস্ব তহবিল থাকবে, যা সরকার প্রদত্ত অনুদান এবং নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কমিশন প্রতি বছর সরকারের কাছে বাজেট বিবরণী পেশ করবে এবং অডিট বা নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

মূল বিতর্ক যা নিয়ে 

আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ মনে করে, কমিশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব দ্বারা প্রভাবিত হবে। 

সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা: খসড়ায় ‘সাংবাদিক’ এর সংজ্ঞায় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর ফলে একটি বড় অংশ আইনি সুরক্ষা, অ্যাক্রেডিটেশন ও নিরাপত্তামূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।  

সরকারের কাছে আপিল: কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কমিশনের স্বাধীন সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করবে। 

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বনাম মন্ত্রণালয়ের খসড়া 

জানা গেছে, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল ও প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় সেই পরামর্শ গ্রহণ না করে দুটি পৃথক কমিশনের খসড়া অধ্যাদেশ গত ২৮ জানুয়ারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া ও ‘বিদায়ী পরিহাস’ 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে জনমতের জন্য মাত্র তিন দিন (২৮ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি) সময় দিয়ে এই সংবেদনশীল অধ্যাদেশ প্রকাশের বিষয়টিকে ‘বিদায়ী পরিহাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, মেয়াদের শেষে এমন উদ্যোগ অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি। 

সম্পাদক পরিষদ ও সাংবাদিক সংগঠনের উদ্বেগ 

সম্পাদক পরিষদ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ যথাযথ আলোচনা ও পর্যালোচনা ছাড়া প্রণয়ন গ্রহণযোগ্য নয়। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা বেশি। 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাংবাদিক সমাজ এটি মেনে নেবে না। অতীতেও রাজপথ ছাড়া সাংবাদিকরা কিছু অর্জন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের আমলেও পারবে না, ফলে বিষয়টি আমরা রাজপথেই ফয়সালা করবো।”  

এ প্রসঙ্গে তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন ও সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই অধ্যাদেশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

 

/এসটি/
সম্পর্কিত
ভুয়া ফটোকার্ডের ফাঁদে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিক: সমাধান কোথায়?
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে শেষ শ্রদ্ধা
সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ আসছে শনিবার, দাফন মিরপুরে
সর্বশেষ খবর
‘পূজার ছুটিতে সৈকতে ভিড়, ফাঁকা রিসোর্ট’ আগুনের ঘটনায় কতটা প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটনে?
‘পূজার ছুটিতে সৈকতে ভিড়, ফাঁকা রিসোর্ট’ আগুনের ঘটনায় কতটা প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটনে?
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
ঘরহারা দুই শতাধিক পরিবার
ঘরহারা দুই শতাধিক পরিবার
বাংলাদেশ দলে খেলে ‘হতাশ’ হামজা, ডুলি কী বলছেন?
বাংলাদেশ দলে খেলে ‘হতাশ’ হামজা, ডুলি কী বলছেন?
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক