ভারতের নয়াদিল্লিতে চার দিনের বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে কয়েক ঘণ্টা আগে। যৌথ বিবৃতিতে সীমান্তে শান্তি, আস্থা ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। কিন্তু সম্মেলনের কালি শুকানোর আগেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ওই ১২ জন ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরের অংশে, শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থান করছেন।
ঘটনাটি শুধু একটি সীমান্ত অনুপ্রবেশের চেষ্টা নয়; বরং এটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা এবং সীমান্তের বাস্তবতা কি একই পথে এগোচ্ছে?
বৈঠকের পরও কেন থামছে না পুশইন?
গত ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের সম্মেলনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি ছিল ‘পুশইন’। বৈঠকে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা, ভারতীয় কিংবা অন্য কোনও দেশের নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিপন্থী।’’
বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পরিষ্কার। যে ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হবে, তাকে গ্রহণ করা হবে। তবে সেটি অবশ্যই প্রচলিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অন্যদিকে বিএসএফের দাবি, জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য পাঠানো বহু আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। তাদের মতে, যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই অবস্থানের মধ্যকার ব্যবধানই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
দৌলতপুরে নতুন উত্তেজনা
শুক্রবার (১২ জুন) ভোরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের চর বিলগাথুয়া এলাকায় ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ, চারজন নারী এবং চারজন শিশু রয়েছে।
বিজিবি ও স্থানীয় জনতা তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দিয়ে পুনরায় মাথাভাঙ্গা নদী পার করে ভারতীয় অংশে ফিরিয়ে দেয়।
প্রাগপুর বিজিবি কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘১২ জনকে পুশ ইন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ভারতের প্রায় ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।’’ কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
সীমান্তে নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় ভিন্ন। আগে যেখানে সীমান্ত উত্তেজনা মূলত অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত হত্যাকে কেন্দ্র করে দেখা যেত, এখন শূন্যরেখা ক্রমেই মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় দেখা গেছে, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের রাতের অন্ধকারে সীমান্তে এনে তারকাঁটার বেড়ার কাছাকাছি ফেলে রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কে বাংলাদেশি, কে ভারতীয়, আর কে রোহিঙ্গা— তা নির্ধারণ করাই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।
শুধু গত কয়েক সপ্তাহেই ২১টি পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। এসব ঘটনায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ দুই শতাধিক মানুষ ভুক্তভোগী ছিলেন।
কেন জটিল হচ্ছে সংকট?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে অন্তত তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, জাতীয়তা যাচাইয়ের সংকট। সীমান্তে আনা ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত কাউকে বাংলাদেশি দাবি করলেও বাংলাদেশ প্রমাণ চায়। আবার অনেকের কাছেই কোনো বৈধ পরিচয়পত্র থাকে না। ফলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা। বাংলাদেশের মতে, যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্তে পাঠানো বিদ্যমান প্রটোকলের লঙ্ঘন। ভারতের মতে, তারা নিজস্ব আইনি কাঠামো অনুসরণ করছে এবং বাংলাদেশকে যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে। এই ব্যাখ্যাগত পার্থক্য কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব। সীমান্ত ইস্যু এখন আর শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তবাসীরা প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছেন, রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসূচি দিচ্ছে। একই সময়ে ভারতে অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক ও মানবিক সমস্যা ক্রমশ রাজনৈতিক মাত্রা পাচ্ছে।
শুধু পুশইন নয়, অমীমাংসিত আরও অনেক ইস্যু
দিল্লির সম্মেলনে পুশ ইন ছাড়াও সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের বেড়া, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, রোহিঙ্গা সংকট, পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম, নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত পিলার এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণাসহ নানা বিষয় আলোচনায় আসে।
বিজিবি সদর দফতরের মুখপাত্র কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম জানান, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, পুশইন বন্ধ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ বিএসএফের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কিংবা জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট করা হয়নি।
সংকট বাড়তে পারে
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সীমান্তে আকস্মিক সংঘর্ষ, শূন্যরেখায় আটকে পড়া নারী-শিশুদের মানবিক বিপর্যয় এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পুশ ইন, সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের বেড়া এবং রোহিঙ্গা সংকট যখন একই সময়ে আলোচনায় আসে, তখন যেকোনো ছোট ঘটনা দ্রুত বড় কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
দিল্লির সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে— বাংলাদেশ ও ভারত কেউই প্রকাশ্যে সংঘাত চায় না। উভয় দেশই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু দৌলতপুরের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, যৌথ বিবৃতির ভাষা এবং সীমান্তের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি এক হয়নি।
‘পুশইন’ সম্পূর্ণ বেআইনি ও অমানবিক
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বহুবার পুশ ইনের চেষ্টা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষেত্রেই তা সফল হয়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানোর একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। ভারত সরকার বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত করা গেলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে গ্রহণ করা হয়।’’
উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৭ মে মানবপাচারের শিকার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া ৩৬ জন বাংলাদেশিকে সরকারি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তার ভাষায়, বৈধ ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু বন্দুকের ভয় দেখিয়ে, রোদ-বৃষ্টি কিংবা পানির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি, অমানবিক ও নিন্দনীয়।
তার মতে, এ ধরনের ঘটনা সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ায় এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নাগরিকত্ব যাচাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রত্যাবাসন হওয়া উচিত।








