‘পুশইন’ থামেনি, বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা

জামাল উদ্দিন
১৩ জুন ২০২৬, ২১:৪৫আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ২১:৪৫

দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ‘পুশইন’ কার্যক্রম রোধে উদ্বেগ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।

বৈঠকের পরই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। আর ২৪ ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন মুজিবুর রহমান (২২) নামে এক তরুণ।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দুই দেশের সর্বোচ্চ সীমান্ত পর্যায়ের বৈঠকের পরও কেন থামছে না পুশইন? কেন বন্ধ হচ্ছে না সীমান্ত হত্যা?

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে অসংখ্য মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে বিজিবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এ অবস্থায় সীমান্তে নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে। কারণ সীমান্তে যা ঘটছে, তা আর কেবল অনুপ্রবেশ বা অভিবাসন ইস্যু নয়; এটি এখন মানবিক মর্যাদা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

বিজিবি সূত্র বলছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘পুশইন’-এর একাধিক চেষ্টা হয়েছে। সর্বশেষ ১২ জুন রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁ সীমান্তের রোকনপুর এলাকায় নদীপথে ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির বাধার মুখে ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বিএসএফ সদস্যরা তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

এর আগে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তেও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তজুড়ে অতিরিক্ত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে বিজিবি।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। অনেক এলাকায় গ্রামবাসীরা রাতভর পাহারা দিচ্ছেন, যাতে মানবপাচারকারী চক্র বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত ব্যবহার করতে না পারে।

জিরো লাইনে নতুন মানবিক সংকট

পুশইন ঠেকাতে গিয়ে সীমান্তের শূন্যরেখা বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে নতুন মানবিক সংকটেরও সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বেশ কয়েকজন মানুষ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নাগরিকত্ব বা প্রত্যাবাসন নিয়ে বিরোধ থাকলেও কাউকে জোরপূর্বক এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে এনে ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তাদের মতে, প্রত্যাবাসন একটি দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। এটি সীমান্তে তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘‘জোরপূর্বক পুশইন সম্পূর্ণ অবৈধ ও অমানবিক। পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।’’

সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সীমান্তে মানুষ হত্যায় প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের এমন নজির পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়।’’

ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে কী হলো?

৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যা ছিল অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।

বৈঠকে বিজিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, কোনও ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হলে প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে গ্রহণ করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। তবে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামো উপেক্ষা করে একতরফাভাবে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা এবং পুশইন কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ বারবার জোর দিয়ে বলছে, অবৈধ অভিবাসন বা নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিরোধের সমাধান বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। সীমান্তে উত্তেজনা এড়াতে এবং মানবিক ও আইনসম্মত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ পর্যন্ত ১৩টি কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।

কেন বাড়ছে পুশইন বিতর্ক?

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ অভিবাসন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। নির্বাচনি রাজনীতি, নাগরিকত্ব যাচাই এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ সীমান্ত প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে।

তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে সীমান্তে মানবিক সংকট তৈরি হওয়া উচিত নয়। কারণ এতে শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সীমান্ত পাহারা জোরদার করে এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। নাগরিকত্ব যাচাই, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চলমান পুশইন বিতর্ক এখন আর কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক আস্থারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
এবার নদীপথে পুশইন, বিজিবির প্রতিরোধে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো বিএসএফ
সাড়া দিচ্ছে না বিএসএফ, ২৯ ঘণ্টা ধরে সীমান্তের শূন্যরেখায় ১২ জন
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
সর্বশেষ খবর
বন্ধ ও রুগ্ন কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা
বিজিএমইএ’র নতুন প্রস্তাব ঘিরে বিতর্কবন্ধ ও রুগ্ন কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা
ওয়ারীতে ৫৭ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই: আরও ৩ জন গ্রেফতার
ওয়ারীতে ৫৭ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই: আরও ৩ জন গ্রেফতার
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
৮৮ বছর প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল, এবার কী করবে?
৮৮ বছর প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল, এবার কী করবে?
সর্বাধিক পঠিত
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
এক থানার ১১ পুলিশ বরখাস্ত
এক থানার ১১ পুলিশ বরখাস্ত