আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (২৪ জুন) বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিন লিখিত প্রশ্ন টেবিলে উত্থাপিত হয়। বিকাল তিনটায় শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের বৈঠকে এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
প্রসঙ্গত, বিবিএস এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
নওগাঁ-৩ আসনের এমপি মো. ফজলে হুদা তার প্রশ্নে জানতে চান— দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ কোনও বরাদ্দ রাখা হয়েছে কিনা?
জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।”
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, “সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় সরকার লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লক্ষ নারীকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদানের জন্য ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ১০০ উপজেলায় ৪২ দশমিক ৫ লক্ষ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এ বাবদ ১,০৬২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাদের ভোগক্ষমতা ও জীবিকা সুরক্ষা বজায় রাখা।”
খাদ্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখার জন্যও সরকার একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৫ লক্ষ উপকারভোগী পরিবারকে কর্মাভাবকালীন ৬ মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল প্রদান করা হচ্ছে। সারা দেশে ১ হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যার আওতায় প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের উদ্যোগ এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ দশমিক ১৯ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাজেটে উত্তরাঞ্চলের জন্য আলাদা অংকভিত্তিক বরাদ্দ নির্দিষ্ট করা না হলেও সামগ্রিকভাবে ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লক্ষ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের আওতায় দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড-চেইন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও লজিস্টিকস উন্নয়নের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” সরকার মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন-এই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।








