‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চায় ঢাকা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৫ জুন ২০২৬, ১৫:১৪আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ১৫:১৪

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিকে মাথায় রেখে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় ঢাকা। তিনি বলেন, আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতাকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর করতেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় সেন্ট্রাল দিআওইউতাই বেইজিংয়ের  হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিভিন্ন দিক তিনি উল্লেখ করেন। প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে যান। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত “অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস” সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। যে সব দেশের প্রধানমন্ত্রীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি এবং কাজাখস্তান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সেখানে সরকার গঠনের পর গত চার মাসে জলবায়ু খাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সুধীবৃন্দের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, প্রথম বিদেশ সফরের তৃতীয় পর্বে চীনের  প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি গতকাল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান। মালয়েশিয়া ও দালিয়ানের ধারাবাহিকতায় বেইজিংয়েও প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, বর্ণাঢ্য লালগালিচার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে বরণ করা হয়। মোটর শোভাযাত্রা, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ও উচ্চ পর্যায়ের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে দাওতি স্টেট গেস্টহাউজে নিয়ে যাওয়া হয়— যা সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসন সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মালয়েশিয়া এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতোই এখানেও তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে মাত্র ২৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সফর করেছেন। এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন রয়েছেন।

তিনি বলেন, মূলত চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো— বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ঐকমত্য

মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। চীনা মন্ত্রী এ খাতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মাহদী আমিন বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২৫ জুন সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং বিডার যৌথ উদ্যোগে "ইনভেস্ট বাংলাদেশ" নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে চীনের ৮০ জন প্রথম সারির ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ—এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ব্যাবসায়িক নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করে।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা

মাহদী আমিন বলেন  তারেক রহমানের সঙ্গে ২৫ জুন বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই হয়।

বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রত্যয়

মাহদী আমিন বলেন, চীনে রাষ্ট্রীয় সফরকালে বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন- অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

মাহদী আমিন জানান, ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে এসে তিনি এই দেশ থেকে অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তার মা প্রধানমন্ত্রী  খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় সফরের মাধ্যমে সেই বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করেন। পিতা-মাতার সেই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, বাংলাদেশ-চীন অংশীদারত্বকে তিনি আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। একইসঙ্গে তাকে ও তার প্রতিনিধিদলকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।

বিকালে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ

মাহদী আমিন জানান, বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় চীনের প্রিমিয়ার তথা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ১৫টি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এগুলো চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরদার করার পথে প্রভাবক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন।

কাল চীনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক

মাহদী আমিন জানান চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায়, আর বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাহদী আমিন।

/এমকে/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই
বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে: রিজভী
তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীনের ঐকমত্য 
সর্বশেষ খবর
ঘুষ-দুর্নীতিতে শীর্ষে পাসপোর্ট অফিস-বিআরটিএ
টিআইবির প্রতিবেদনঘুষ-দুর্নীতিতে শীর্ষে পাসপোর্ট অফিস-বিআরটিএ
স্কলাসটিকায় দুদিনব্যাপী ‘এ’ লেভেলের শিক্ষাসমাপনী
স্কলাসটিকায় দুদিনব্যাপী ‘এ’ লেভেলের শিক্ষাসমাপনী
প্রাথমিক শিক্ষায় সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ সরকারের: ববি হাজ্জাজ
প্রাথমিক শিক্ষায় সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ সরকারের: ববি হাজ্জাজ
শেষ মুহূর্তে স্থগিত অনুপম রায়ের ঢাকার কনসার্ট
শেষ মুহূর্তে স্থগিত অনুপম রায়ের ঢাকার কনসার্ট
সর্বাধিক পঠিত
২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
যশোর জেলা জাতীয় পার্টি২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
‘আওয়ামী লীগের আছে,  বিএনপি-জামায়াতের যাওয়ার জায়গা নেই’ 
‘আওয়ামী লীগের আছে, বিএনপি-জামায়াতের যাওয়ার জায়গা নেই’ 
সঞ্চয়পত্র বিক্রি নিয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা
সঞ্চয়পত্র বিক্রি নিয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা
ইরান-মার্কিন সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে কী পেলো পাকিস্তান
ইরান-মার্কিন সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে কী পেলো পাকিস্তান
২৭ জুনের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি
২৭ জুনের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি