দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক উপদেষ্টা ও হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া বলেছেন, ‘কোটিপতিদের হাজার টাকা দিলেও লাভ নেই, গরিবের ১০০ টাকাই সচল রাখে অর্থনীতি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিন বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। সংসদের বিকালের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের টাকা মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমানত রেখে সৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদ আদায় করছে, যা চরম অদক্ষতার প্রমাণ। দেশের কোনও কোটিপতিকে অতিরিক্ত হাজার টাকা দিলে তা অর্থনীতিতে কোনও প্রভাব ফেলে না; কিন্তু একজন গরিব মানুষকে ১০০ টাকা দিলে সে তা সঙ্গে সঙ্গে বাজারে খরচ করে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল ও গতিশীল রাখে। তাই কোটিপতিদের তোষণ বন্ধ করে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
তিনি বলেন, অর্থনীতিতে ‘ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশন’ বা আয়ের সুষম বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ধনী মানুষকে অতিরিক্ত এক বা দুই হাজার টাকা দিলে তা হয়তো খরচই হবে না, কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষ সেই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয় করে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় এবং বাজারে সবচেয়ে সস্তা চালের দামের অনুপাত দেখলেই সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়। তার মতে, জনবান্ধব সরকারের উচিত নিয়মিত এ সূচকের দিকে নজর রাখা।
তিনি বলেন, দেশের অর্থ দিয়ে শুধু বড় বড় শপিং মল বা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী শিল্প ও কারখানা স্থাপনের দিকে নিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছাবে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ৫ শতাংশ সুদ দিলেও ব্যবসায়িক ঋণে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। এটি ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতার প্রতিফলন।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে ড. কিবরিয়া বলেন, এক বছর সুদ পরিশোধ না করলেও খেলাপি হিসেবে গণ্য না করার পরও দেশে খেলাপি ঋণের হার ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশ ছাড়ালেই উদ্বেগ তৈরি হয়। সেখানে ৬১ শতাংশ খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ বর্তমানে জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ঋণ নেওয়াকে তিনি ‘চরম বোকামি’ বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়া অধিক উপযোগী।
মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় হার নিয়ে তিনি বলেন, মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হার, মুদ্রানীতি, প্রবৃদ্ধি ও রাজস্বনীতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় টাকার বিনিময় হারও ধারাবাহিকভাবে কমছে। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সমালোচনা করে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, বিগত ১৫ বছরে সরকারের রাজস্ব আদায় কখনও লক্ষ্যমাত্রার ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশের বেশি হয়নি। উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরে বাজেট প্রণয়ন করায় বছর শেষে সরকারকে ব্যাংক, বেসরকারি খাত ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়।









