বাজেট বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ ও পদক্ষেপের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২৯ জুন ২০২৬, ১৭:২০আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১৭:২০

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। 

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।  

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার এমন এক সময়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যখন একদিকে ছিল ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’, অপরদিকে ছিল নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তাই এই বাজেট কেবল বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা।” 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সংসদের সদস্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমের দেওয়া মতামত সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।” দায়িত্বশীল সমালোচনা ও গঠনমূলক পরামর্শ বাজেটকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কৌশল 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় এবং সরকার এটিকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে।”  

অর্থমন্ত্রী জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, ব্যবসার খরচ কমাতে ডিরেগুলেশন ও ডিজিটাইজেশন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। 

মন্ত্রী বলেন, “এসব উদ্যোগের ফলে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে।”  

৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ 

প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত সম্প্রসারণ, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে মূলধারায় আনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

‘থ্রিআর’ কৌশলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন— এই তিন ধাপের ‘থ্রিআর’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে।” 

অর্থমন্ত্রীর দাবি— “অতীতের ভুল নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার বিকৃতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।” 

তিনি বলেন, “কৃষি, শিল্প, সেবা, রফতানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়া হবে।” 

রাজস্ব আদায়ে করের হার নয়, বাড়ানো হবে করভিত্তি 

রাজস্ব আহরণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে চায়। এই লক্ষ্যে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের ব্যবস্থা করা হলেও কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ব্যবস্থার বাইরে থাকবে।” 

অর্থমন্ত্রীর দাবি— “অর্থনীতিতে স্থবিরতা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চার মাসের উদ্যোগে প্রথমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় চার লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।” ফলে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা 

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি নিয়েছে। 

“প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অপরদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।” 

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ ধারণক্ষমতা নিম্ন ঝুঁকি থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে নেমে এসেছে।” 

মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই ঋণের সুদও বর্তমান সরকারকে পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

“এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।” একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন, ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং এবং বিদেশে বাংলাদেশভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। 

পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ 

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, “পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি চূড়ান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বড় ঋণগ্রহীতা ছয়টি গ্রুপের বিরুদ্ধে সিভিল প্রসিডিংস শুরু এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও চলছে।” 

পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বাস 

একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।” 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী এবং হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একইভাবে ডিপিএস হিসাব থেকেও দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।” 

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল 

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারা ১৮(ক) বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, “জনগণের সম্পদ যারা লুট করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থও পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা হবে।” 

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে একগুচ্ছ কর সুবিধা 

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে অর্থমন্ত্রী একগুচ্ছ কর সুবিধার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে যে কোনও পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তর করে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানি কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া আইপিও, ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু অথবা রিপিট পাবলিক অফারের (আরপিও) মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করলে আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর ছাড় দেওয়া হবে। এছাড়া তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত যেকোনও কোম্পানি সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন করলে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর সুবিধা পাবে। ফলে নগদহীন লেনদেনকারী এবং অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করা তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম হবে। 

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর করহার ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বিদ্যমান ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, “ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে, যার প্রতিফলন শেয়ার সূচকের ঊর্ধ্বগতিতে দেখা যাচ্ছে।” 

‘আইএমএফ থেকে শূন্য হাতে ফিরিনি’ 

বাজেট আলোচনায় উত্থাপিত আইএমএফ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে শূন্য হাতে ফেরেনি। আগের সরকারের সময়ে নেওয়া ঋণ কর্মসূচির কিছু শর্ত দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সরকার নিজ উদ্যোগেই ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার সুযোগ খোলা রয়েছে।” 

বিনিয়োগ হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বিভিন্ন বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে যে সমঝোতা করেছেন, তা সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” 

ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে সহজ হবে ব্যবসা 

ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে সরকার ডিরেগুলেশন নীতিকে অন্যতম প্রধান সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, “অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং অনুমোদননির্ভর রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সেবানির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করাই এই নীতির লক্ষ্য। ‘রাষ্ট্র যেন বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক নয়, বরং বিনিয়োগের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে’— সরকার সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।” 

দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে শিল্পায়ন, রফতানিমুখী উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির সম্প্রসারণে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও জানান তিনি। উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তা কমাতে প্রতিটি সরকারি সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। 

জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনসহ সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি স্থাপন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।” 

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে উল্লেখ করে জনগণের ধৈর্য ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

কর্মসংস্থানে জোর শিল্প, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার এমন একটি উৎপাদনমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ নতুন কর্মসংস্থানে রূপ নেবে। শিল্প, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে নেওয়া কর্মসূচির মাধ্যমে ঘোষিত কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এছাড়া শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।” 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণদের প্রধান শক্তি হবে তাদের মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে প্রবৃদ্ধির স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে।” 

বাস্তবায়নই হবে বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে নিহিত— এ কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “ভালো নীতি ও পরিকল্পনাও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।” 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন আগামী দিনে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।” 

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, “দীর্ঘ দেড় দশকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি অর্থনীতির অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। তাই বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।” 

১০ অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখে বাজেট বাস্তবায়ন 

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাজেট বক্তৃতায় ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখেই আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।” 

অগ্রাধিকার খাতগুলো হলো— সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি, ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে সহজ ব্যবসা পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন। 

তিনি বলেন, “বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকার চারটি নীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এগুলো হলো— ভ্যালু ফর মানি, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা।” 

ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জোর 

বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে সরকার ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময় ও ব্যয়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি শক্তিশালীকরণ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, সঠিক নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ যে সহনশীলতা ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, তা সরকারের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।” 

/এসএমএ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে বক্তব্যের সমালোচনায় যা বললেন রুমিন
বাজেটে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ফল ভোগ করতে হয় বছর ধরে: রুমিন ফারহানা 
কাঁচাবাজার-ক্ষুদ্র মুদি দোকান ভ্যাটের বাইরে থাকবে
সর্বশেষ খবর
২৯ খাল দখলমুক্ত করবে ডিএনসিসি: শফিকুল ইসলাম
২৯ খাল দখলমুক্ত করবে ডিএনসিসি: শফিকুল ইসলাম
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে রায় মঙ্গলবার
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে রায় মঙ্গলবার
হাম উপসর্গে প্রাণ হারালো আরও ৪ জন
হাম উপসর্গে প্রাণ হারালো আরও ৪ জন
হামের মধ্যেই ডেঙ্গুর হানা, ২৪ ঘণ্টায় ৫ মৃত্যু
হামের মধ্যেই ডেঙ্গুর হানা, ২৪ ঘণ্টায় ৫ মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে অর্থনীতিতে কী ঘটতে পারে?
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে অর্থনীতিতে কী ঘটতে পারে?
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের