X
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪
২ শ্রাবণ ১৪৩১

দেশব্যাপী জমে উঠেছে বৈশাখী অর্থনীতি

শফিকুল ইসলাম
১৩ এপ্রিল ২০১৬, ২২:১৭আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৬, ২২:১৯

নববর্ষের অর্থনীতি দেশব্যাপী জমে উঠেছে বৈশাখী অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত বিক্রেতারা। কিনতে ব্যস্ত ক্রেতারা। গ্রামে ও শহরে কেনাকাটায় ধুম লেগেছে। সর্বত্র এখন কেনাকাটা। মাটির বাসন, মাটির গহনা থেকে সোনার গহনা। মুরালি, চিরা, দই ও নকুল দানা থেকে পোলাওয়ের চাল ও মাংস। গেঞ্জি ফতুয়া থেকে শাড়ি। বাঁশের বাঁশি থেকে স্টিল আলমারি ও খাট। বিছানার চাদর থেকে পর্দা ও ফ্লোর কার্পেট। সব পণ্যের দোকানেই এখন ভিড়। এই ভিড় সার্বজনীন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে কাস্টমার এ সব দোকানে। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। পহেলা বৈশাখের এই কেনাকাটায় সব একাকার। ক্রেতা বিক্রেতা কারোরই এখন দম ফেলার ফুসরত নেই। যেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা। এই কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কত টাকা লেনদেন হচ্ছে? কত টাকার বাণিজ্য হচ্ছে? তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। এর পরিসংখ্যান কেউ তৈরি করছেন কিনা তাও জানা যায়নি। সবাই শুধু বলছেন, বৈশাখকে কেন্দ্র করে জমে উঠছে গ্রাম ও শহরের অর্থনীতি। অথবা বৈশাখের অর্থনীতি চাঙ্গা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

শহরে কম হলেও বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রামের ব্যবসায়ীরা বেচাকেনার পাশাপাশি নতুন বছরের হালখাতা করার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর এ কাজটি করতে গিয়ে পুরনো বছরের পাওনা দাওনার হিসাব কষছেন ছোটবড় ব্যবসায়ীরা। পুরনো পাওনা আদায় শেষ করে খদ্দেরের নামে নতুন খাতা খোলাই হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে সোনার দোকানদার সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন। সব ব্যবসায়ীরাই তাদের সারা বছরের স্থায়ী খদ্দেরদের হালখাতা অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিচ্ছেন। সব কিছু মিলিয়ে এখন শহর ও গ্রামের বৈশাখের অর্থনীতি তেতে উঠেছে। প্রতিবছরই এর পরিমান বাড়ছে।

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে অনেকেই বেড়িয়ে পড়ের শহর ছেড়ে গ্রামে, আবার কেউ গ্রাম থেকে শহরে আসেন শহরের বৈশাখ উদযাপন দেখতে। আবার কেউ যান পর্যটন এলাকাগুলোয়। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার। কেউ যান একা, আবার কেউ ছোটেন পরিবার পরিজন নিয়ে। তাই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পর্যটন এলাকার হোটেল মোটেল রেস্তোরাঁসহ সব ধরণের ব্যবসায়ীরাই এখন ব্যস্ত। আর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সেসব এলাকার হাটবাজারেও বেচাবিক্রি বাড়ছে। সচল হচ্ছে সেখানকার অর্থনীতি।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট বিপনি বিতানগুলো বাঙালির প্রাণের উৎসব ঘিরে সাদা-লালে ছেয়ে গেছে নানা ধরণের বৈশাখী আয়োজন। নানান ডিজাইনের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছে রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় মার্কেটগুলো। মার্কেটগুলো সাজানো হয়েছে পহেলা বৈশাখের আদলে। কেনাকাটার উৎসব দেখে মনে হয় ঈদের বাজার। নতুন পোশাক কেনা তো আছেই, সঙ্গে আছে আরও অনেক কিছু। পহেলা বৈশাখের খাবার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ইলিশ। একদিনের এই উৎসবে কয়েক শ’ কোটি টাকার ইলিশ বেচাবিক্রি হয়।

আরও পড়ুন: পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে না সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতিবছরই বাড়ছে বৈশাখের কেনাকাটা। বাড়ছে উৎসবের পরিমাণ। বাড়ছে ধরন। সব মিলিয়ে বৈশাখের কর্মকাণ্ডে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। গত দুবছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় থমকে গিয়েছিল পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে এ ধরণের কর্মকাণ্ড। বর্তমানে ওই অবস্থা না থাকলেও আছে অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তা ছাপিয়ে চলছে এ বছরের পহেলা বৈশাখের আয়োজন।

বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন ধরনের মেলা বসে। প্রায় সপ্তাহব্যাপী চলে এই মেলা। মেলাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের খেলনাসামগ্রী, মিষ্টিজাতীয় পণ্য, কাঠের আসবাবপত্রসামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্যের সমাবেশ ঘটে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও টাকার প্রবাহ বাড়ে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ক্রেতা আকর্ষণে এখন মুঠোফোনে কথা বলা থেকে ইন্টারনেট চালানো, কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই দেওয়া হচ্ছে বিশেষ অফার বা বিশেষ ছাড়। এমনকি টেলিভিশন, ফ্রিজ, গাড়ি ও বাড়িতেও আছে লোভনীয় বৈশাখী অফার।

বৈশাখ ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুল ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়। মানুষ সব কিছুর সঙ্গে ফুলও কেনেন। নিজেকে সাজাতে ফুলের কোনও বিকল্প নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীতে পাইকারি বাজারে ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। আর পহেলা বৈশাখের মতো বিশেষ দিবসে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। সেই হিসাবে বৈশাখ ঘিরে ৬০-৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয় বলে বলে জানিয়েছেন ফুল ব্যবসায়ী সমিতি।

বৈশাখের অন্যতম বড় দিক হচ্ছে- নতুন পোশাক। নারী পুরুষ ভেদে পোশাকের কদর বেড়ে যায় সর্বত্র। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫-৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সদরঘাট, জিঞ্জিরা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। এসব পোশাক এখন শোভা পাচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এ বিষয়ে বিক্রেতারা বলছেন, ঢাকায় বৈশাখ ঘিরে ঈদের মতো মার্কেট জমে ওঠে। তা ছাড়া প্রতিবছরই ঢাকার বাইরে প্রচুর পরিমাণ পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস থেকে নেওয়া হয়। এ বছর পোশাক বিক্রি গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ২০ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দিন বদলে গেছে। আগের তুলনায় পহেলা বৈশাখের ধরন ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। একসময় ছিল এ অনুষ্ঠানটি হতো গ্রামে। এখন শহর ছাপিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে বর্ষবরণের এই উৎসবটি। বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি হওয়া শাড়ি, কুটির শিল্প কিংবা খেলনা সব কিছুতেই থাকছে গ্রামীণ ছোঁয়া। এসব পণ্যের নগরকেন্দ্রিক বাজারও গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে চুড়ি, মাটির তৈরি পণ্য, কুটির শিল্পসহ নানা পণ্য তো রয়েছেই। এ কাজের সঙ্গে বেড়েছে অনেকের কর্মসংস্থান।

পহেলা বৈশাখে পোশাক, খাদ্য, আসবাবপত্রের সঙ্গে গহনার ক্ষেত্রে সামান্য বৈচিত্র এসেছে। বিত্তবানরা স্বর্ণের গহনা কিনলেও মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তরা ঝুঁকছেন মাটির গহনার দিকে। নববর্ষের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ও পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাটির গহনার ক্রেতা বেশি। মাটির গহনার দুটি ভালো দিক। প্রথমত হচ্ছে ঐতিহ্য ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, গহনার বাসনা পূর্ণ করা। তৃতীয়ত হচ্ছে দাম কম। তাই এসব ভালো দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে মাটির গহনার চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০০ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা দামে পর্যন্ত মাটির গহনা পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি মেটাল ও পাথরের গহনার কদরও বেশ।

আরও পড়ুন: আলোচনার শীর্ষে পান্তা-ইলিশ, ভুভুজেলা ও বিকেল ৫টার বাধ্যবাধকতা

/এসআই/এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ছাত্রলীগ করা শিক্ষার্থীদের ক্লাস করাবেন না বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা
ছাত্রলীগ করা শিক্ষার্থীদের ক্লাস করাবেন না বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা
দফায় দফায় সংঘর্ষে আরও একটি উত্তাল দিন
দফায় দফায় সংঘর্ষে আরও একটি উত্তাল দিন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জনগণ যখন আশ্বস্ত, তখনই অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা: কাদের
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জনগণ যখন আশ্বস্ত, তখনই অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা: কাদের
বৃহস্পতিবার সাধারণদের জন্য মার্কিন দূতাবাস বন্ধ থাকবে
কোটা আন্দোলনবৃহস্পতিবার সাধারণদের জন্য মার্কিন দূতাবাস বন্ধ থাকবে
সর্বাধিক পঠিত
আমার প্রাণের বাংলাদেশ এভাবে রক্তাক্ত হতে পারে না: শাকিব খান
আমার প্রাণের বাংলাদেশ এভাবে রক্তাক্ত হতে পারে না: শাকিব খান
সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা আন্দোলনকারীদের
সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা আন্দোলনকারীদের
ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের রুমে ভাঙচুর
ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের রুমে ভাঙচুর
থমথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস 
থমথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস 
অস্তিত্বে হামলা এসেছে, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুত হয়ে যান: ওবায়দুল কাদের
অস্তিত্বে হামলা এসেছে, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুত হয়ে যান: ওবায়দুল কাদের