জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকার বলছে, জুলাই সনদকে ধারণ করেই সাংবিধানিক ভাষায় সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখেই এ কাজ সম্পন্ন হবে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন কমিটির সদস্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বৈঠকের ১২ সদস্যের অন্য সদস্যরা।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘আজ (৪ আগস্ট) বাংলাদেশ একটি নতুন অভিযাত্রা শুরু করলো। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ৩৩টি রাজনৈতিক দল যে জুলাই সনদে সই করেছিল, সেই সনদকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছেন। আজ আমরা সেই কমিটির প্রথম বৈঠক করেছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবো, জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলবো, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যারা সংগ্রাম করেছেন তাদের সঙ্গে কথা বলবো। সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত নেবো। যারা জুলাই সনদ প্রণয়নে নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। এরপর আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধান সংশোধনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।’’
কমিটির গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘প্রথমে ১৭ সদস্যের কমিটি করার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে সাতজন বিএনপির সংসদ সদস্য, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী চারটি রাজনৈতিক দলের চার সদস্য, একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং বিরোধী দলের আরও পাঁচজন সদস্যকে রাখার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু বিরোধী দল সময় চেয়ে পরে জানায়, তারা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না। এরপরও সরকার তাদের জন্য পাঁচটি আসন খালি রেখেছে।’’
প্রসঙ্গত, কমিটি গঠনের দিন বিরোধী দল সংশোধন নয় সংস্কার দাবি করেন। তবে সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি করা হলে বিরোধী দল সংসদ বর্জন (ওয়াক আউট) করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা স্পষ্ট—বিরোধী দল যখনই তাদের পাঁচটি নাম দেবে, তখনই তাদের এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনতে চাই, যাতে জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়।’’
বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘জুলাই সনদে কোথাও যদি কোনও রাজনৈতিক দল দ্বিমত পোষণ করে এবং সেই অবস্থান তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে সেটিই প্রাধান্য পাবে। এটি জুলাই সনদেই লেখা আছে। আইনের ভাষায় এটিকে হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন বলা হয়। এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার কোনও সুযোগ নেই।’’
তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দলের সুপারিশও জুলাই সনদের মধ্যেই রয়েছে। কারণ ৩৩টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। কেউ কমিটিতে না এলেও তারা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। যদি তারা মনে করেন, জুলাই সনদের ব্যত্যয় ঘটছে, তাহলে সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার তাদের থাকবে। যৌক্তিক সমালোচনা আমরা গ্রহণ করার চেষ্টা করবো।’’
সংবিধান সংশোধনে নতুন সংসদ সদস্যদের ভূমিকা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘সংসদের ২৬২ জন সদস্য নতুন। বিরোধী দলের একজন সদস্য ছাড়া বাকি সব সদস্যই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তাই এখানকার কার্যক্রম ও বিভিন্ন বিষয় বুঝে কার্যকরভাবে অবদান রাখতে তাদের কিছুটা সময় লাগতে পারে। আমাদের দরজা সব সময়ই খোলা আছে। তারা যখনই আসবেন, তখনই আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত করবো।’’
পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় গঠিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে বর্তমান কমিটির তুলনা টেনে এক সাংবাদিক জানতে চান, বিরোধী দল অংশ না নিলে বর্তমান কমিটির সংস্কার প্রস্তাব কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের গঠিত বিশেষ কমিটিতে শুধু আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরাই ছিলেন, বিরোধী দলের কেউ ছিলেন না। তার পরিণতি কী হয়েছে, তা সবাই দেখেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। জুলাই সনদে ৩৩টি রাজনৈতিক দল সই করেছে। সেখানে বিরোধী দলের সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই তারা কমিটিতে না এলেও জুলাই সনদের মাধ্যমেই তাদের অবস্থান বিবেচনায় থাকবে।’’
সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এক বা দুই বছরের জন্য সংবিধান সংশোধন করছি না। আগামী প্রজন্মের জন্য করছি। সময়ের চাহিদা, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনের আলোকে এই সংশোধন হবে। শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে নয়, জুলাই সনদ, বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি এবং সাংবিধানিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো অনুসরণ করেই আমরা এগোবো।’’
ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভারতের সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হওয়ার পর ১০৬ বার সংশোধন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও একাধিক সাংবিধানিক সংশোধনী হয়েছে। তাই সংবিধান সংশোধনের বিকল্প নেই। সংবিধানের একটি শব্দ বা একটি অক্ষর পরিবর্তন করলেও সেটি সংবিধান সংশোধন। আমরা সেই সংস্কারের কাজ শুরু করেছি। বিরোধী দল যখনই সদস্যদের নাম দেবে, তখনই তাদের মতামত নিয়ে এই কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।’’
১২ সদস্যের কমিটি
কমিটির সভাপতি কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন— বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভোলা- ১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল হক, চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ফারজানা শারমিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শাকিলা ফারজানা, শেরপুর- ৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল এবং বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।

জুলাই স্মরণে বিএনপির আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছেন তারেক রহমান







