দেশ পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি জনগণকে সর্তক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে দলের শীর্ষ নেতা এবং শরিক দলের শীর্ষ নেতারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ এখন চায় আমাদের বলা কথাগুলো এখন আমরা বাস্তবায়ন করি। জনগণ চায় শান্তি, সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা অথবা যার যেটা যোগ্যতা সে অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করবে। জনগণ একইসঙ্গে চায়, তার যে রাজনৈতিক অধিকার সেটি যেন সময়মতো প্রয়োগ করতে পারে।
জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আমার নিজের দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা আমাদের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন, তারাসহ নাম জানা না জানা অরাজনৈতিক বহু মানুষ জুলাই আন্দোলনে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, সরকারের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে এবং সামনের দিনে সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব হবে আমরা করবো। পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলতে চাই, জুলাই আন্দোলনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আমরা তাদের সঙ্গে আছি। একইসঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
‘বিএনপিকে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পথে ধরে রাখতে চায়’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান এ দেশের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত দেশে খালেদা জিয়ার সময় প্রায় ৮০ হাজার শিল্পকারখানা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কাজেই তাদের সেই দল তাদের সেই পথকেই ধরে রাখতে চায়। এ জন্যই আমরা এমন কাজগুলো করতে চাই, যে কাজগুলোর ফল জনগণ পায়। শুধু কথা শুনবে না, জনগণ দেখবে, ইয়েস, বিএনপি এই কাজগুলো করবে। সে দেখবে আমি, আমার পরিবার, আমার সন্তান একটি সেফ পজিশনে আছি। বিএনপি এই কাজগুলো করেছে বলেই আমরা একটি নিশ্চিত সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের রাজনীতি এটাই হওয়া উচিত। অনেকে অনেক কথা বলবে, সবার সব কথায় এত কান দেওয়ার দরকার নেই।
তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন বিভিন্নজন বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, বিভিন্নজন বিভিন্ন কিছু হারিয়েছেন জীবনে। আমি আমার বাড়িঘর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। যেই বাড়ি রেখে আমি চলে গিয়েছিলাম, সেই বাড়ি তো আমি দেখিনি। আমরা সবাই বহু কিছু হারিয়েছি।
তারেক রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে এই যে প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের ফুটবল খেলা হলো। ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে এতে অংশগ্রহণ করেছে। আমরা অনেকে বহু সমস্যার কথা বলি। একটি সমস্যার কথা সবাই বলে। কী সেটা? আমাদের তরুণ সমাজ ড্রাগে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিভিন্নভাবে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। এখন আপনি কতজনকে চিকিৎসা দেবেন আর কতজনকে আপনি ধরে ধরে জেলে দেবেন? সম্ভব এটা?
তারেক রহমান বলেন, আপনারা এখানে যারা বিএনপির নেতাকর্মী আছেন, আপনারা সবাই একটি নামের সাথে পরিচিত। নামটা হচ্ছে ফাতেমা। নিশ্চয়ই আপনারা চেনেন সবাই। আম্মার (বেগম খালেদা জিয়া) সাথে ফাতেমা ছিল। সে আম্মার সাথে জেলও খেটেছে। ফাতেমার এক ছেলে আছে। ওইদিন জাইমা (জাইমা রহমান) আমাকে কথাটা বলছিল। বিষয়টা কী? ঘটনাটা শুধু বলি... ফাতেমার ছেলে এখন ফাতেমার সাথে থাকে। আম্মার সাথে যখন ফাতেমা ছিল তখনও দেশের বাড়িতে থাকতো। এখন বড় হয়েছে, এখন ওর ছেলে-মেয়ের সাথে থাকে। একটা ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়ে ওরা ঢাকাতেই থাকে। আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে।
তিনি বলেন, ওর ছেলে একদিন ওকে বলছে, আমাকে ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করে দাও। কেন খলবে জজ্ঞাসা করা হলে সে বলে, হ্যাঁ ফুটবল আমি এই জন্য খেলবো, আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে, যাদের আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আমি যদি ওখানে না যাই ওরা আমাকে জোর করে টেনে নিয়ে যাবে। আমি ভালো থাকতে পারবো না। আমি ফুটবল খেললে পড়ালেখার পাশাপাশি ভালো থাকবো। ওরা আমাকে নিতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে জন্যই আমরা বলতে চাচ্ছি যে, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস। আমরা শিক্ষা কার্যক্রমটাকে সেভাবেই চালাতে চাই এবং সেভাবেই ঢেলে সাজাতে চাচ্ছি। জুলাই চেতনা বলেন, স্বাধীনতার চেতনা বলেন, বা যেটাই বলেন, আমরা এটাতেই বিশ্বাস করি। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হয়েছি যেটা সেটা হচ্ছে শহিদ জিয়া এভাবে চিন্তা করতেন দেশের মানুষের জন্য, খালেদা জিয়া এভাবেই চিন্তা করতেন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। স্বাভাবিকভাবে আমিও একইভাবে চিন্তা করবো আমার দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য।
‘আমরা জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে আছি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলন জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। জুলাই আন্দোলন আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলেছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে সাফ বলে দিয়েছি, এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এটি কোনও একক ব্যক্তি, একক কোনো রাজনৈতিক দলের ক্রেডিট নয়।
তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল যাদের অনেক নেতৃবৃন্দ আজকে এই মঞ্চে বসে আছেন, আমরা মাঠে ছিলাম। আমাদের নেতাকর্মীরা বিএনপি হোক তার প্রত্যেকটি অঙ্গ সহযোগী সংগঠন হোক প্রত্যেকটি নেতাকর্মী জনগণকে একা মাঠে ফেলে আমরা চলে যায়নি। বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সফলতা এসেছে। জনগণ সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত ছিল বলে এটা সফল হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই আগস্টে যে আন্দোলন এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই, সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। ঠিক যেভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র চেয়েছে বলে সেদিন আমাদের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিল।
বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংস্কার প্রস্তাব এবং পরবর্তীতে শরিকদলগুলো নিয়ে ৩১ দফার সংস্কার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বিগত যে নির্বাচনটি আমরা পার হয়ে এসেছি, যে নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষে তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই নির্বাচনে আমরা জনগণের সামনে আমাদের ৩১ দফা উপস্থাপন করেছি। এই ৩১ দফা উপস্থাপন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার মাধ্যমে একটি বিষয় আমি মনে করি পরিষ্কার হয়েছে, সেটি হচ্ছে যে সংস্কার প্রস্তাব বা রাষ্ট্র মেরামতের দফাগুলো আমরা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম, সেটি দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মাধ্যমে আমরা সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেছিলাম, সেই প্রস্তাবকেই বিগত নির্বাচনে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে।
তিনি বলেন, কাজেই এটি এখন আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কোনও ৩১ দফা নয়; বরং আমি মনে করি এই ৩১ দফাটা হচ্ছে জনগণের ৩১ দফা। এখন জুলাই জনগণের জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে, জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেই গণতান্ত্রিক অধিকারও সফলতার পথ ধরে এতদূর পর্যন্ত আজ এসেছে। আমাদের ৩১ দফার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যে অধিকার সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।
১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিভাজিত প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি বিধবস্ত ব্যবস্থা পেয়েছি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও ছিলেন জুলাইয়ের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু ।
বিএনপির মহানগর উত্তর বিএনপির আমিনুল হক, দক্ষিণ বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, যুব দলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন ও ছাত্রদলের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাকিব এ সময় বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।









