জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ট্রান্সফার অব প্রপার্টিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। গত ৬ সেপ্টেম্বর আইন পাসের সময় এটি ইসলামের সম্পত্তি হস্তান্তর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্ররা। তাদের দাবি, বিলটি কোরআন সুন্নাহবিরোধী। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের একতরফা এ আইনের অংশীদার হতে চান না, তাই তারা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেছেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামমত নেওয়ার দাবি জানান।
অপরদিকে সংসদের বাইরে গত কয়েকদিন বিলটির পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক চলছে। ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা মনে করেন, এটি মুসলিম সমাজের উত্তারিধকার ব্যবস্থা, ফরায়েজ ও নারীদের উত্তরাধিকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। এ নিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
অপরদিকে মালিকানা একজনের নামে গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখলে সেটি হেবা হিসেবে গণ্য হবে কিনা, সংসদে এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, নতুন পদ্ধতি মুসলিম আইনের হেবা নয়। হেবা বা অন্য কোনও আইনে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিও এতে বাধাগ্রস্ত হবে না। বিলের ১২২-এ ধারার ৪ উপধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘নতুন পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর হেবা বা অন্য কোনও আইনে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করবে না।
পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি, সম্মিলিত ফতোয়ার হুঁশিয়ারি?
মুসলিম পারিবারিক আইনে হেবা সাধারণভাবে জীবিত অবস্থায় স্বেচ্ছায় সম্পত্তি দানকে বোঝায়। অপরদিকে কোনও মুসলিম ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তি কারা কতটুকু পাবেন, সে বিষয়ে উত্তরাধিকার বা ফারায়েজের বিধান কার্যকর হয়।
তবে নতুন আইন অনুযায়ী সরকারের দাবি, এ পদ্ধতিটি হেবা নয়। এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক আইনগত প্রক্রিয়া। আইনের ১২২এ(৪) উপধারায়ও বলা হয়েছে, নতুন বিধান কোনও গিফট, হেবা বা অন্যকোনও স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতাকে সীমিত বা ক্ষুণ্ন করবে না।
আর বিরোধী দলের আপত্তির জায়গা হলো— আইনটিতে আলাদা পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করলেই বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে হেবা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
এ নিয়ে দুই পক্ষের বাহাসের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, সম্পত্তি সন্তান বা নাতি-নাতনিসহ অন্য ওয়ারিসদের নামে দান বা হেবা করে দেওয়ার পরও কি বাবা-মা বা দাদা-দাদি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন, বা দান করার পরই-বা সম্পত্তির মালিকানা কার কাছে থাকবে, আর ভোগের অধিকার কার কাছে থাকবে? বিশেষ করে গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলেই বা কী হবে?
এক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের মধ্যে সম্পত্তি দান করেও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকার মনে করে, এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি এবং আইনের ১২২এ(৪) উপধারায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এটি প্রচলিত গিফট, হেবা বা অন্যকোনও স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করবে না। বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তরের মূল আইন ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’। এই আইনে সম্পত্তি দানসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এ আইন শরিয়ার মূলনীতির বিরোধী। কারণ এর মাধ্যমে শরিয়তের পরিভাষা নষ্ট করা হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘একজন বাবা-মা চাইলে আগেও সন্তানকে হেবা বা বৈধ উপায়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারতেন। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিতে দেশে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনও রয়েছে। তাহলে নতুন করে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগকে কেন আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে— সরকারকে তার জবাব দিতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই আইন বাস্তবায়ন হলে হেবা আইনের পাশাপাশি মিরাশ নিয়েও সমস্যা হবে। এ বিষয়ে আমরা সরকারকে সময় দিতে চাই।’’ তিনি জানান, সরকার এটি সংশোধন না করলে সম্মিলিত ফতোয় আসতে পারে।
কীভাবে সমাধান দেখছে বিএনপি ও জামায়াত
ট্রান্সফার অব প্রপার্টিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলটিকে শুরুতেই ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে আসছে ধর্মীয় সংগঠনগুলো। এরই মধ্যে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এ ধরনের আইন ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ তা মেনে নেবে না। ইসলামি দলগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও তারা তা পাস করেছে। আমরা মনে করি, এটি এক ধরনের সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র। বিষয়টি সেরকার অন্য পদ্ধতিতে সমাধান করতে পারতো।’’ তিনি মনে করেন, এ আইন সরকার বলবৎ রাখলে দেশ অস্থির হতে পারে। এই সময়ে এটি হওয়া কাম্য নয়।
তিনি বলেন, ‘‘এ নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। তাই বিষয়টি নিয়ে দেশের শীর্ষ স্থানীয় স্কলারদের সঙ্গে বসা উচিত।’’
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আইনটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছে সরকার। এ আইনে সম্পত্তি বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা ও বিনিময় দানের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। এটি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয় না। তারপরও এ নিয়ে কারও অনুভূতিতে আঘাত আসলে আলোচনার সুযোগ আছে। সরকার নিশ্চয়ই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রাখবে। তবে আমরা মনে করি, এ নিয়ে অহেতুক মাঠ গরম করা উচিত নয়।’’

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন: আলোচনা-সমালোচনার মাঝে কেমন হলো সংশোধনী







