প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। গত সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকালে রাজধানীর গুলশানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মন্দিরে আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দলের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস এনে রাখার জন্য সাগরে দুটি জাহাজ রয়েছে। যার মালিকানা বিদেশি কোম্পানির। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। যে কারণে অপর একটি জাহাজের ওপর চাপ পড়েছে। পাইপলাইনে সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। এখন আমরা চেষ্টা করছি গ্যাস আনার জন্য। আশা করি, আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তেলের মতো গ্যাসের ক্ষেত্রেও একটি অসাধু চক্র তৈরি হয়েছে। যারা একটি মেশিন দিয়ে জোর করে পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে সে নিজে লাভবান হলেও অন্য দশজনকে কষ্টে ফেলছে। এই জিনিসগুলোকে আমাদের রোধ করতে হবে। সরকার একা এটা পারবে না। কেউ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেল নিয়ে গেলে সবাইকে প্রতিরোধ করতে হবে।
চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সমস্যা সারা দেশে আছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ ব্যাপারে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষও এ ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আমরা সরকার গঠনের ১২ দিন পর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রভাব পড়ে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
‘প্রথমে আমরা জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে কিভাবে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া যায় সেটা করেছি। বিভিন্ন দেশের তেলের দাম বাড়লেও দেশে প্রথমে আমরা দাম বাড়াইনি। কিন্তু কিছু অসাধু মানুষ তেলের ব্যবহার এমনভাবে শুরু করলো, আমরা বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘অনেকেই বলেন দেশের গ্যাস উত্তোলন বাদ দিয়ে বিদেশ থেকে কেন গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে? হয়তো দেশের মাটিতে গ্যাস থাকতে পারে। কিন্তু সেটার প্রকৃত অবস্থা আমরা এখনও জানি না। কারণ গত ১৭ বছর স্বৈরাচারী সরকার পুরো জিনিসটাকে এমনভাবে বিদেশ নির্ভর করে তুলেছিল যে, দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু বানিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্নভাবে এখানে সুবিধা দিয়েছিল।’
‘শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ যাতে জ্বালানিখাতে পুরোপুরি বিদেশ নির্ভর হয় সেই ব্যবস্থা তারা করেছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাপেক্সকে সক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু গ্যাসের অনুসন্ধান অনেক ব্যয়বহুল। ইতোমধ্যে ১৩০টি গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে যখনই আমরা গ্যাস পাবো, তখন এই সমস্যার উন্নতি হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই দায়িত্ব অনেক কঠিন। বিশেষ করে বিগত এক যুগেরও বেশি সময় একটি স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টের অধীনে ছিল এই বাংলাদেশ। যেই বাংলাদেশকে শক্তি দিয়ে, মানুষের সমর্থন দিয়ে নয়, বরং অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে মানুষের ভোটের ও কথা বলার অধিকার জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মানুষের কাঁধে তারা চেপে বসেছিল। সেসময় দেশের মানুষের ওপর কীভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে তা দেশের মানুষই দেখেছে। আমরা বিভিন্নভাবে দেখেছি ও জেনেছি, কীভাবে দেশের মানুষের ও রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যয় করেছে। এমনকি বিদেশেও পাচার করেছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। এই অর্থ ও এই সম্পদ সম্পূর্ণভাবে দেশের মানুষের। আমরা সরকার গঠনের পর থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য চেষ্টা করছি। এসব সম্পদ যাতে দেশের মানুষের জন্য ব্যয় করা হয়। আমাদের লক্ষ্য হলো দুটি। একটি, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তৃণমূল ও সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।
তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়ে গেছেন। বর্তমান সরকারও নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা স্নাতক পর্যন্ত ফ্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা ঢাকা-১৭ আসনে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মধ্য দিয়ে সেই কাজ উদ্বোধন করেছি। নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে ৪১ লাখ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছাতে পারবো। আমাদের একটি শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী জাতি চাই। এভাবে দেশ আস্তে আস্তে স্বাবলম্বী হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কাছে ধর্মের কারণে কোনও ভেদাভেদ নেই। সারা দেশে অনেক ধর্মগুরু আছেন যারা কষ্ট করেন। আমরা তাদের সহায়তার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। সেই কাজও আমরা শুরু করতে পেরেছি। এভাবে কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দেওয়ার ওয়াদা করেছিলাম। কৃষকের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ করতে পেরেছি। এভাবে আমাদের সব প্রতিশ্রুতির প্রত্যেকটিই আমরা শুরু করতে পেরেছি। এখানেই স্বৈরাচার ও বর্তমান সরকারের পার্থক্য।’
‘যেহেতু আমাদের নির্বাচিত করেছে এই দেশের জনগণ। সেজন্য আমাদের দায়িত্ব হলো সরকারের পক্ষে যতটুকু সম্ভব জনগণের ওয়াদা পূরণের চেষ্টা করবো।’









