ধর্মীয় জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে দেশের সব ধর্মের লোকের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন একটি মঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি এলাকায় সব ধর্মের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি সর্ব ধর্মীয় সংগঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ উদ্যোগটি সরাসরি মনিটরিং করছে পুলিশ সদর দফতর। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে আগামী ২৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার। এদিন, রাজধানীতে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হঠাৎ করেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। অতীতে বাংলাদেশের চিত্র এমন ছিল না। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যেন কোনও ধরনের সংঘাত যেন আর না ঘটে, এ জন্য সবাই মিলে মিশে থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার একটি সম্মেলন হবে। সেখানে বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকবেন। এরপর প্রতি বিভাগীয় জেলা শহরেও এমন সম্মেলন করা হবে। সব ধর্মের লোক মিলিয়ে একটি মঞ্চ তৈরি করা হবে। যেখানে সবাই মিলেমিশে থাকবেন। আমরা একটি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছি। এর মাধ্যমে এলাকার মধ্যে কোনও ধরনের সমস্যা থাকলে সবাই মিলে সহজে সমাধান করতে পারবেন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১ হাজার নেতাকে নিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্মেলন’ । এ সম্মেলনের পর বিভাগীয়, জেলা পর্যায়েও হবে একই রকম সম্মেলন। এলাকাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতার জন্য কমিটিও গঠন করা হবে।
আরও পড়ুন: সাত খুনের দুই বছর: সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কায় নিহতদের পরিবার
সূত্র জানায়, ২৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজধানির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১ হাজার নেতা উপস্থিত থাকবেন। ইসলামের বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার খতিব, ইমাম, শিক্ষক ৫০০ জন, হিন্দু ধর্মের ২০০জন, বৌদ্ধ ধর্মের ১৫০ জন, খ্রিস্টান ধর্মের ১৫০ জন এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল উপস্থিত থাকবেন। সভাপত্বি করবেন মহাপুলিশ পরির্দশক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। এ সম্মেলনের প্রস্তুতি সভা গত শনিবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অুনষ্ঠিত হয়। সেখানে সব ধর্মের নেতাদের পাশাপাশি মহাপুলিশ পরির্দশকসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, ধর্মীয় উগ্রতা রোধ করে সম্প্রতি সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পুলিশ। গত বছর ডিসেম্বর থেকেই দফায় দফায় বৈঠক হয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে। ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দফতরে আয়োজিত ‘ইসলামের দৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা থেকেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের আলেমদের ফতোয়া দেওয়ার বিষয়ে মত দেন ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। ওই সভায় আইজিপি শহীদুল হক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আলেমদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে আহ্বান জানান। ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্মেলনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। জঙ্গিবাদ, ধর্মী উগ্রতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা।
আরও পড়ুন: ‘সিসিটিভির ফুটেজে ঘাতকরা’ (ভিডিও)
এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও ধর্মই সংঘাত, সন্ত্রাসের কথা বলে না। আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন স্থানে উস্কানি নিয়ে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। মৌলিকভাবে এসবের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে পুলিশের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
সর্বশেষ গত শনিবারও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে সমন্বিত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। আপাতত সম্মেলনে সবার অভিমত নেওয়া হবে।
সম্প্রীতি সম্মেলন প্রসঙ্গে খাদেমুল ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান বলেন, আমাদেরও সম্মেলনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শনিবার প্রস্তুতি সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরাও সম্প্রীতির জন্য পরামর্শ দিয়েছি।
আরও পড়ুন:
এ কোন বর্বরতা!
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্মল রোজারিও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে এমন একটি আয়োজন করার ভাবনা মাস খানেক আগের। আমাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। তিনি এই বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। আসলে ১০ বছরে আগেও দেশে এমন পরিস্থিতি ছিল না। সব ধর্মের মানুষের মধ্যকার সম্প্রীতির ব্যত্যয় ঘটে অস্থিরতা, বিদ্বেষের ঘটনা ঘটছে। সব ধর্মের মানুষের কাছে ধর্মীয় নেতাদের গুরুত্ব আছে, তাদের একত্রিত করে একটি সম্প্রীতির বন্ধন করতে এ সম্মেলন। শুধু সম্মেলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় পরবর্তী সময়ে যেন সুফল পাওয়া যায়, এ জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে সম্মেলন ও সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে একটি কমিটি করারও পরিকল্পনা আছে।
/এমএনএইচ/
আপ-এসটি








