গুলশান হামলার অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত মারজান দেড় বছর আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েছে। ২০১৫ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারির পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আর দেখা যায়নি তাকে। কোনও রকম যোগাযোগও রাখেনি বিভাগের সঙ্গে। তাই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ও পুনঃভর্তি না হওয়ায় তাকে আর প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র হিসেবে স্বীকার করছে না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজ্রিস্ট্রার জানিয়েছেন, তার ছাত্রত্ব স্বাভাবিক নিয়মেই বাতিল হয়ে গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত নিখোঁজের তালিকায় তার নাম ছিল না বিভাগটি থেকে সময়মতো তথ্য না পাওয়ার কারণেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় মারজানের নাম নুরুল ইসলাম। রোল নম্বর ১৩১০৭০৩০। ২০১২-১৩ সেশনে আরবি বিভাগে ভর্তি হয়। তবে দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনালের ১০টি পরীক্ষার ছয়টিতে অংশ নেওয়ার পর হঠাৎই ক্যাম্পাস ছাড়ে সে। এরপর তাকে আর ক্যাম্পাসে দেখা যায়নি।
বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথমবর্ষে তার রেজাল্ট ছিল সিজিপিএ ৩ দশমিক ৪৮। সে সোহরাওয়ার্দী হলের অনাবাসিক ছাত্র ছিল। ক্লাসে তাকে দেখা যেতো জুব্বা ও পাঞ্জাবি পরে আসতে। সে শিবিরের সাথী ছিল বলেও পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বিভাগে পাওয়া নথিপত্র থেকে আরও জানা গেছে, মারজান পাবনার দারুল উলুম মারকাজিয়া মাদ্রাসা থেকে ২০১০ সালে দাখিল এবং আরিফুল জামিউল ছাজিল মাদ্রাসা থেকে ২০১২ সালে আলিম পাস করে।
মারজানের ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে গেছে দাবি করে তার ব্যাপারে কোনও দায় নিতে রাজি নন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নুরুল ইসলাম (মারজান) আরবি বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের ছাত্র ছিল। সে দুই বছর যাবত অনুপস্থিত থাকায় এবং নতুন করে ভর্তি না হওয়ায় তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সে আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও দায়িত্বও নেই।
সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিখোঁজ ছাত্রদের যে তালিকা পাঠানো হয়েছিল তাতে নুরুল ইসলাম ওরফে মারজানের নাম নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আরবি বিভাগ থেকে নাম না পাঠানোয় ওই তালিকায় তার নাম ওঠেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশ সত্ত্বেও আরবি বিভাগ কেন আপনাদের কাছে তালিকা পাঠায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরবি বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগ সময়মতো ওই তালিকা দিতে না পারায় তালিকাটি এখনও অসম্পূর্ণ।এসব বিভাগ সময় চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছিল। আমরা তাদের সময় বাড়িয়েছি। এ বিভাগগুলোকে আগামী সপ্তাহের মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বলেন, আরবি বিভাগের সময় বাড়ানো হয়েছে। আগামীকাল বুধবার তারা এ তালিকা জমা দেবে। পাশাপাশি আরও যেসব বিভাগ তালিকা দেয়নি তাদের আগামী রবিবারের মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, আরবি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, আরবি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ইসমাইল চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের তালিকা দিতে দেরি হয়। এজন্য সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল।
তার ছাত্রত্ব বাতিল প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. কামরুল হুদা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সে যেহেতু পুনঃভর্তি হয়নি, সে কারণে তার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে সেসব বিভাগ অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা দেয়নি তাদের আগামী রবিবারের মধ্যে অবশ্যই জমা দিতে বলা হয়েছে।
তবে ছাত্রত্ব চলে গেলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মারজানের দায় এড়াতে পারে কিনা দেখা দিয়েছে সে প্রশ্নও। কারণ, বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাধিক শিক্ষার্থী একইভাবে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকে জঙ্গি হামলার ঘটনায় যুক্ত থাকায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে। তাই ‘নিখোঁজ’ মারজান ও এর আগে বগুড়ায় বোমা বানাতে গিয়ে নিহত পদার্থবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারদিনের ব্যাপারে দায় এড়াতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কেন দায় এড়াবো? এখানে দায় এড়ানোর কি আছে? যেহেতু সে আমাদের ছাত্র ছিল এবং আরবি বিভাগের ছাত্র ছিল এবং সেখানের শিক্ষকরা তাকে পড়িয়েছে সেহেতু দায় তাদের ওপরেই বর্তায়। ওই বিভাগে উদ্দেশ্যমূলক কোনও সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি এ ধরনের সিলেবাস পাওয়া যায় তাহলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুপুরে আরবি ও ইসলামি স্ট্যাডিজ বিভাগে তারা তল্লাশি চালিয়ে এ দুটি বিভাগের গ্রন্থাগার থেকে বিতর্কিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবু আলা মওদুদীর লেখা বই উদ্ধার করেছেন। পরে এ দুটি বিভাগকে এমন বিতর্কিত লেখকদের বই না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মারজান শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী।পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনিও জানান, নুরুল ইসলাম শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পদে থাকা এক শিক্ষকও জানান, ২০১৫ সালে আব্দুর রব হল থেকে শিবিরের সাবেক সেক্রেটারির একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। সেই ল্যাপটপে থাকা কর্মী তালিকায় সাথী হিসেবে নুরুল ইসলামের নাম পাওয়া যায়।
এর আগে ফারদিন নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থীও জঙ্গিগিরিতে গিয়ে নিহত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ওই শিক্ষার্থী জেএমবির শুধু সদস্যই ছিল না, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্বেও ছিল। কয়েক মাস আগে বগুড়ায় বোমা বানানোর সময়ে বিস্ফোরণে যে দু’জনজেএমবি সদস্য নিহত হয় তার একজন হচ্ছে ফারদিন। অপরজনের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। দীর্ঘদিন অজ্ঞাত পরিচয় থাকার পরে ফারদিনের পরিচয় পেয়েছিল পুলিশ। তবে মারজান ও ফারদিনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল কিনা সে বিষয়ে কোনও তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
গত ১২ আগস্ট শুক্রবার র্যাবের তথ্য পাওয়ার অ্যাপে মারজানকে গুলশান হামলার অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একটি ছবি প্রকাশ করে তার ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়। এরপরে জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি পাবনার সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের আফুরিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম নিজাম উদ্দিন, মা সালমা খাতুন। পাবনার পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর কবীর সোমবার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মারজান আট মাস ধরে স্ত্রীসহ উধাও রয়েছে। তার কোনও খবর বাড়ির কেউ জানে না। পর্দানশীল পরিবারের সদস্য হওয়ায় তার ব্যাপারে এতদিন খোঁজ রাখেনি কেউ। এদিকে, তার ব্যাপারে তথ্য জানতে তার বাবাকেও সোমবার রাতে আটক করা হয়েছে। মারজানের বোন আফিয়া সুলতানা আয়েশা এ দাবি করেন।
গুলশান হামলার তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ সন্দেহে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরীরও খোঁজ করা হচ্ছে। তামিম চৌধুরী প্রায় দুই বছর আগে কানাডা থেকে দেশে আসে। এরপর থেকেই সে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর একটি অংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। জেএমবি-র ওই অংশটি নিও-জেএমবি নামে পরিচিত। এদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপনে তামিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুলশান হামলার সঙ্গে নিহত পাঁচ জঙ্গিদের সঙ্গে আরও অন্তত ১০-১২ জন সরাসরি জড়িত ছিল। তাদের অনেক তথ্যই পুলিশের হাতে রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
/এসএনএইচ/টিএন/
এ সম্পর্কিত আরও খবর:
মারজানের বাবা আটক, দাবি পরিবারের
বউসহ আট মাস ধরে নিখোঁজ মারজান!








