কী হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২১:০১, ডিসেম্বর ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, ডিসেম্বর ০২, ২০১৭

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রদ্রুত এগিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার রূপপুরে পদ্মার পাড়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। এটি বর্তমান সরকারের সাত মেগা প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ  একটি প্রকল্প। বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের মূল কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।  সবকিছু ঠিকমতো চললে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আর প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিট থেকে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর বলেন, ‘প্রকৌশল চুক্তি ও নির্মাণ শিডিউল অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক কাজ চলছে। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের নির্মিত প্রযুক্তির অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ সেফটি সিস্টেমের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনও ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে না। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে যেকোনও দুর্ঘটনায় এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ লোকালয়ে যাবে না। কাজেই এটাকে ঝুঁকিমুক্তই বলা যায়।’

প্রতিদিন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশি কর্মী মিলে প্রায় এক হাজারের বেশি কর্মী দিন-রাত কাজ করছেন। এ প্রকল্পের জন্য থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর বসানো হচ্ছে। যেটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি। যা শুধু রাশিয়ার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে  বাংলাদেশের রূপপুরেই বসানো হচ্ছে। এছাড়া রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে মূল স্থাপনার জন্য সয়েল স্ট্যাবলিস্টমেন্টের কাজ চলছে পুরোদমে। সেখানে ১৭ হাজার ৪৫০ কিউবিক মিটার কংক্রিটিং করা হবে, কারণ সেখানকার মাটি অপেক্ষাকৃত নরম। তাই যন্ত্রের মাধ্যমে মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত সিমেন্ট মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে প্রথম পর্যায়ে চার হাজার কিউবিক মিটারের কাজ শেষ হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের ভারী মালামাল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর জন্য ২২ কিলোমিটার রেললাইন নির্মিত হচ্ছে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৯ কোটি টাকা। পৃথক এ রেললাইন ঈশ্বরদী বাইপাস টেক অব পয়েন্ট থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত যাবে। এর বাইরেও একটি ‘বি’ শ্রেণির রেলওয়ে স্টেশন, সাড়ে চার কিলোমিটার লুপ লাইন, সাতটি কালভার্ট, গেটসহ সিগন্যালিং ব্যবস্থাসহ ১৩টি লেভেল ক্রসিং থাকছে।

ইতোমধ্যে  প্রকল্পের পাওনিয়ার বেইজ ও ইরেকশন বেইজের কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে প্রটেকশন ড্যাম (বাঁধ) তৈরির কাজ। ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার লম্বা এবং ১৩ মিটার প্রস্থ এ বাঁধের কাজও এগিয়েছে অনেকদূর। এদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রথম পর্যায়ে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা ছিল। কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় পরে ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এছাড়া আরও ২১৯ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। নতুনভাবে অধিগ্রহণ করা পদ্মার বিশাল চরে চলছে মাটি ভরাটের কাজ।

মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে তৈরি হচ্ছে গ্রিনসিটি আবাসন পল্লি। পাবনা গণপূর্ত অধিতদফতর এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যেই তিনটি সুউচ্চ ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ তলা ১১টি বিল্ডিং এবং ১৬ তলা ৮টি বিল্ডিংয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ২২টি সুউচ্চ ভবন তৈরি হবে এ চত্বরে। এছাড়া, থাকবে মাল্টিপারপাস হল, মসজিদ ও স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ সালে পাবনার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এ প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর ও আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর ১৯৬৯-১৯৭০ সালে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (১২৫ মেগাওয়াট) নির্মাণসংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বাতিল করা হয়। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৮ সালে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের দু’টি কোম্পানির দ্বিতীয়বার ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে ৩০০-৫০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।

২০০৯ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক কার্যাবলি ও পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হয়। এজন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) মধ্যে 'পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার' বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।  ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ২০১৬ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূলপর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সার্বিক কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। এর জন্য ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল স্থাপনার ‘রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং (উৎপাদন কেন্দ্র)’ নির্মাণকাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

 

/এএম/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ