১৬ জানুয়ারি ১৯৭২: বিজয়ের একমাস

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:৫০, জানুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৮, জানুয়ারি ১৭, ২০২০

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় বিজয় উদযাপনে কিছুটা ঘাটতি ছিল। একমাস পূর্তিতে সেই ঘাটতি কাটিয়ে উঠে বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে উদযাপিত হয় বিজয়ের আনন্দ, ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি বিজয়ের একমাস পূর্তির দিনে।

এই একমাসে নানা আনন্দ-বেদনার কাব্য নিয়ে এগিয়েছে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজে হাত দিয়েছেন। এরইমধ্যে দেশের শাসনতন্ত্র শুরুর কাজে হাত দিয়েছে নির্দিষ্ট কমিটি। আর স্বজন হারানোর খবরটুকু যারা পাননি, তারা তখনও অপেক্ষা করছেন, হয়তো ফিরে আসবেন প্রিয় মুখগুলো। বঙ্গবন্ধু ফেরার আগে পর্যন্ত যারা দেশ পরিচালনা করেছেন, তাদেরকেও নিতে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সিদ্ধান্ত। আর মাসপূর্তিতে মুনাফাখোর ও কালোবাজারিদের চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দেন—‘ষড়যন্ত্রকারীদের এই দেশে ঠাঁই নেই।’

মুনাফাখোর ও কালোবাজারিদের হুঁশিয়ারি

বঙ্গবন্ধু একমাসের মাথায় এসে দেশের জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সতর্ক করে দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এসব দুষ্কৃতকারীদের ক্ষমা নেই।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম আপনারা বাড়াতে পারবেন না। স্বাধীন বাংলায় এধরনের অপচেষ্টা চালানো হলে ভবিষ্যৎ আপনাদের অন্ধকার হয়ে যাবে। মুনাফাখোর ও কালোবাজারিরা যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চেষ্টা করে, তবে তাদেরকে কঠোর পরিণাম ভোগ করতে হবে।’ শোক দিবস উপলক্ষে বাস্তুহারাদের সভায় বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, ‘ছিন্নমূল জনসাধারণের পুনর্বাসনের জন্য সরকার জমি বরাদ্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

যারা সুযোগসন্ধানী তাদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা এখন স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীনতার মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। স্বাধীনতা অর্থ গুন্ডামি বদমায়েশি নয়। জোর করে কারও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া মানে স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা অর্থ সম্মান নিয়ে, ইজ্জত নিয়ে বাস করা। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার শপথ নিয়েছি। সোনার বাংলার সোনার মানুষ নিয়ে ধৈর্য ধরে আমরা গড়ে তুলবো শোষণমুক্ত সমাজ।’

 

শাসনতন্ত্রে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের ইঙ্গিত

যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ চলছে সেটি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মন্ত্র সম্বলিত হবে বলে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্যের মধ্যদিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়। তিনি শোকদিবসের বক্তৃতায় বলেন, ‘জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ভেঙে গেছে। নতুন করে জাতির ইচ্ছে অনুযায়ী তা গড়ে তুলতে হবে।’ এবিষয়ে দৈনিক বাংলা সংবাদ প্রকাশ করে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাতীয় শোকদিবসের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘লক্ষ রাখতে হবে যেন পতাকা কখনও ভূলুণ্ঠিত না হয়।’ রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশের জন্য যে শাসনতন্ত্র প্রণীত হচ্ছে তাতে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা রূপায়িত হবে। এই শাসনতন্ত্র স্বাধীনতার সুফল আস্বাদনের জন্য জনগণকে দেবে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। জনগণ এমন এক শাসনতন্ত্র চেয়েছিল, যাতে দেশ পাবে গণতন্ত্র ও সব মানুষের সমানাধিকার।’

সামরিক জোটে যাবে না বাংলাদেশ

মাত্র একমাস বয়সী বাংলাদেশ সামরিক জোটে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এই দিনে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মূলনীতি হলো—সামরিক জোটে যোগ না দেওয়া। নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সব জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব।

 

 

ইয়াহিয়া সাত মার্চ প্রতারণা বার্তা পাঠিয়েছিল

এই প্রথমবারের মতো অর্থমন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭ মার্চের দিনটিতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা আলোচনা সভায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন বক্তৃতা নিয়ে কাজ করছিলেন, সে সময় ইয়াহিয়ার কাছ থেকে একটি বার্তা আসে। যেখানে বলা হয়—‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য যা চাচ্ছেন, তাকে তার চেয়ে বেশি দেওয়া হবে।’ তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত জনতাকে বলেন, ‘সেই মুহূর্ত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।’ বাসসের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করে দৈনিক বাংলা। ১৭ জানুয়ারি প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়—১৬ জানুয়ারি বাসাবোতে অনুষ্ঠিত এক সভায় তাজউদ্দীন এসব কথা বলেন। এবং বঙ্গবন্ধু সেটি বুঝতে পেরেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণ ছিল প্রকৃতপক্ষে জাতির প্রতি নির্দেশ। সেনাবাহিনীর সদস্য না হলে কীভাবে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব, সেই বিস্ময় নিয়ে অনেক বিদেশি জেনারেল তাকে (তাজউদ্দীন) প্রশ্ন করেছেন। তিনি  সভায় বলেন, ‘২৫ মার্চের পর আমার সঙ্গে অনেক বিদেশি জেনারেলের সাক্ষাৎ হয়। তারা আমার কাছে জানতে চান—বঙ্গবন্ধু কখনও সেনাবাহিনীতে ছিলেন কিনা? কারণ, তাছাড়া কীভাবে তিনি জাতিকে নির্দেশ দিতে সক্ষম হন, যার ফলে জাতি গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পারে।’

বদরবাহিনীর অফিসে বস্তাভরা মানুষের চোখ

পাকিস্তান সেনারা আত্মসমর্পণের পর তাদের সহযোগী আল বদররা যখন পালিয়ে গেলো, তখন তাদের হেডকোয়ার্টারে পাওয়া গেলো বস্তা বোঝাই চোখ। এটিও প্রথমবারের মতো সামনে আসে একমাস পরে একটি আলোচনা সভায়। এই চোখ এদেশের মানুষের। আল বদররা চোখ তুলে বস্তায় ভরে রেখেছিল দাবি করে আলোচক আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এসব কথা বলেন।

এই দিনে গণমাধ্যমের প্রশাসনিক কিছু পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন করপোরেশনের ডিরেক্টর হিসেবে দাওয়াত দেওয়া হয় বিশিষ্ট সাংবাদিক এবিএম মুসাকে এবং আব্দুল ওয়াহাবকে মর্নিং নিউজের প্রশাসক ও ম্যানেজিং এডিটর করা হয়।

 

স্বাধীনতার একমাসে যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

সংবাদপত্রের পাতা থেকে, বিভিন্ন বইয়ের রেফারেন্স ব্যবহার করে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো সাজানো হয়েছে। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে, যেখানে নেতাকে মুক্ত করা হয়নি, দেশকে শৃঙ্খলায় রাখা ভীষণ কঠিন কাজ। সেটি সম্পাদনের কাজ সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ করেছেন।

জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের পর ১৭ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতারে ঘোষণা দেন—এ বিজয় সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের বিজয়। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ এখন বাস্তব সত্য। এ বিজয় অসম্পূর্ণ, বঙ্গবন্ধু এখনও পাকি কারাগারে বন্দি। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ১০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম ঘোষণা করেন তিনি।

পরের দিন ১৮ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে বলা হয়। ১৯ ডিসেম্বর রবিবার থেকে বাংলাদেশের সব অফিস কাজ শুরু করে। সোমবার ২০ তারিখ বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে সবরকম অর্থ প্রেরণ, সোনা, মূল্যবান পাথর রফতানি নিষিদ্ধ করতে প্রেস নোট জারি করা হলো। সরকারের কাঠামো কী হবে, কাদের সঙ্গে নিয়ে এগোবে এসব হিসাব-নিকাশের মধ্যেই ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।এদিনই লাটভবনের নাম হয় বঙ্গভবন।

২৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, সর্বস্তরে চালু করা হবে। স্টেট ব্যাংকের নাম হবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৫ মার্চের পর গৃহীত সব পরীক্ষা বাতিল করে নতুন পরীক্ষা হবে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার নির্মাণের বিষয়ে কমিটির সিদ্ধান্ত হয়। ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী ঢাকায় আসেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য ও সংহতিই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শক্তির উৎস ছিল।’


২৮ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীন যদি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকার করে, তাহলে উক্ত রাষ্ট্রদ্বয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা হবে।’ একইদিনে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের বাস্তবতা স্বীকার করে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ২৯ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে।’ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির এক আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশে পাকিস্তানি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে।

৩১ ডিসেম্বর সরকার ১৮৫টি শিল্প ইউনিটের পরিচালনা ও দায়িত্বভার গ্রহণ করে সব বোনাস ভাউচার বাতিল করে।

২ জানুয়ারি রবিবার বাংলাদেশের কতিপয় সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা ও প্রকাশনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের (প্রশাসন) সংবাপত্র আদেশে জারি করা হয়। একইদিনে রাষ্ট্রপতি ও  প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন  সব ধর্মের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। ধর্মভিত্তিক সংখ্যালঘু থাকবে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এটি  ছিল অনন্য ঘোষণা। পরেরদিন ৩ জানুয়ারি এএইচএম কামারুজ্জামান ভারতে অবস্থানরত শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনতে ও সব ছিন্নমূলকে পুনর্বাসনের ঘোষণা দেন। সরকার থেকে জানানো হয়—তিন কোটি মানুষকে পুনর্বাসিত করতে দুই হাজার কোটি ব্যয় হবে। এসবের মধ্যে দেশ পরিচালনাকারীরা বারবার বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়ে তাদের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ৩ জানুয়ারি পকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও ৮ জানুয়ারি খবর আসে করাচি থেকে বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করা হয়েছে। তবে কোথায় নেওয়া হয়েছে তা জানানো হয়নি। এরপর বিবিসির ঘোষণার মধ্যদিয়ে জানা গেলো বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে নেওয়া হয়েছে। দৈনিক বাংলার সংবাদ বলছে—বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর পেয়ে সেসময় বাংলাদেশে চারদিকে উল্লাস আর উল্লাস। ১০ জানুয়ারি দুপুরে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন পূর্ণতা পায়। সেই দিনই নেতা রেসকোর্সে সবার সামনে হাজির হয়ে তার অনুভূতি জানান। ১১ জানুয়ারি রাতে রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের অস্থায়ী শাসনতন্ত্র আদেশ জারি হয়। পরের দিন ১২ জানুয়ারি শপথ নিলো নতুন সরকার। এরপর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাদের সঙ্গে ছিল ১১ সদস্যের মন্ত্রিসভা। ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশকে আটটি দেশ স্বীকৃতি দেয়। এই দিন শহীদ স্মরণে জাতীয় শোকদিবস পালন করা হয়। 

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ