কলকাতা সংবর্ধনা দেবে বঙ্গবন্ধুকে, অপেক্ষায় পশ্চিম বাংলা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১০:০৭, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৪, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০

মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তার সরকার ও ভারতের জনগণের সহযোগিতার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বারবারই স্মরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি যে সহযোগিতার হাত তারা বাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ঋণ শোধ করা যাবে না। বিজয়ের পর দেশে প্রত্যাবর্তনের আগে বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে দিল্লি গিয়ে সেই কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করেছিলেন। ফিরে আসার একমাস পর পশ্চিম বাংলা সরকার বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কলকাতা যাবেন। এই সংবাদ চাউড় হওয়ার পর থেকে কলকাতার বাসে-ট্রামে কিংবা রেস্তোরাঁয় সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় খবর। কেবল কলকাতা নয়, বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল পুরো পশ্চিমবঙ্গ। এদিকে ২ ফেব্রয়ারি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার সরকারি বাসভবনে দেখা করেন।

দৈনিক বাংলার ২ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, কলকাতায় ট্রামে বাসে রেস্তোরাঁয় একই কথা— বঙ্গবন্ধু আসছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সফর উপলক্ষে কলকাতায় ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়। তাকে বীরচিত সংবর্ধনা দেওয়া হবে এ জন্য এই প্রস্তুতি। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিরাট মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি, বিভিন্ন রাস্তায় তোরণ নির্মাণ করা হয়, বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখবে বলে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারযোগে বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি রাজভবনে নেওয়া হবে। সেখান থেকে বিকালে তিনি ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ভাষণ দেবেন। বিমানবন্দরে অবতরণের পর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা ব্যাস ব্যান্ডে বাজানো হবে, নাকি পাইপ ব্যান্ড বাজানো হবে— সেটা নিয়েও ভাবনা চলছিল, সবকিছু যেন হতে হবে নিখুঁত।

এদিকে, ধৃষ্টতা দেখিয়ে আবারও বাংলাদেশকে ‘পাকিস্তানের অংশ’ হিসেবে দাবি করেছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো। পিকিংয়ে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন এর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয় নিয়ে কথা বলেন।

বিলাস দ্রব্য ও আপ্যায়নের ব্যয় কমানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সরকারি অফিসে বিলাস দ্রব্য খরিদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ২ ফেব্রুয়ারি তিনি এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। অবিলম্বে এই আদেশ কার্যকর হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হেতু এ আদেশ জারি করা হয়। এ আদেশে নতুন কার্পেট, এয়ারকন্ডিশন ও মূল্যবান আসবাবপত্র কেনাকাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদেশে সরকারি কর্মচারীদের পুরনো দ্রব্যাদি যতদিন সম্ভব ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে আদর-আপ্যায়নে যথাসম্ভব কম খরচ করার জন্য সরকারি কর্মচারীদের আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে বাসসের খবরে বলা হয়েছে।

 

জাতীয় সংগীতের কপি রাইট

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত কবি গুরুর আমার সোনার বাংলার কপিরাইট বিশ্বভারতী বোর্ড বাংলাদেশ সরকারকে প্রদান করেছে। ২ ফেব্রুযারি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জনাব মাসুদের বাসভবনে বিশ্বভারতী বোর্ডের এক বৈঠকে উক্ত স্বরলিপি অনুমোদিত হয়। বিচারপতি মাসুদ ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ এব্যাপারে বিশ্বভারতীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। বাংলাদেশ হতে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল একাধিকবার শান্তি নিকেতনে গিয়ে বিশ্বভারতীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করে আমার সোনার বাংলা গানটির যে সুর বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে, সেটির অনুমোদনে উদ্যোগ নেয়।

আমার সোনার বাংলা গানটির মূল সুরের সঙ্গে প্রচলিত সুরের মিল নেই। শ্রীমতি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী এই গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেন। স্বরবিতানে ১৯৭২ সালেও এই সুরের স্বরলিপি প্রকাশিত হয়ে আসছে। কিন্তু শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র যখন প্রথম গানটি রেকর্ড করেন, তখন মূল সুরটি তিনি বজায় রাখেননি। বিশ্বভারতী সুচিত্রা মিত্রের দেওয়া সুরটি অনুমোদন করে। ফলে স্বরবিতানে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর সুরটাই থেকে যায় এবং গাওয়ার সময় সবাই সুচিত্রা মিত্রের সুরে গাইতে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতে শেষোক্ত সুর প্রচলিত রয়েছে। ইন্দিরা দেবীর দেওয়া সুরে গানটি কোথাও গাওয়া হতো না। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা কয়েকদিন আগে শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতীর উপাচার্য ডাক্তার প্রতুল চন্দ্র সেন, সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ শান্তিদেব ঘোষ ও রিডার শ্রীমতি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই গানটির স্বরলিপির ব্যাপারে আলোচনায় মিলিত হন। বিশ্বভারতী বোর্ড শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর দেওয়া সুরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে সোনার বাংলা গান রেকর্ড করার কথা বলেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা এতে আপত্তি জানান। তারা বলেন যে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে আমার সোনার বাংলা গানের প্রচলিত সুরে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে আজ  এই সুর প্রচলিত। এমতাবস্থায় প্রচলিত সুর পাল্টানো সম্ভব নয়। এছাড়া, বিশ্বভারতী দুটি সুরকেই অনুমোদন দিয়েছে। শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর দেওয়া সুরে জাতীয় সংগীত হিসেবে এটাকে রেকর্ড করা সম্ভব নয় বলেও তারা জানান।

 

গ্রামে গ্রামে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প

শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ দফতরের মন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বাসসের খবরে বলা হয়, মন্ত্রী ঢাকায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থার কর্মচারীদের এক সভায় বক্তৃতাকালে এসব কথা বলেন। সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ করলে বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যাবে। তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প জাতীয়করণের জন্য কোনও পরিকল্পনা সরকারের নেই, তবে দেশে ভারী ও মূল শিল্পগুলো জাতীয়করণ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘তার সরকারের লক্ষ্য হলো— গ্রাম অঞ্চলের মানুষের কল্যাণের জন্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে গ্রাম পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা।’ কুটির শিল্পের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ‘কুটির শিল্প গ্রামের জনসাধারণের জন্য নতুন চাকরির ব্যবস্থা করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালযয়ের অর্থনীতিবিদরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশের যে সম্পদ রয়েছে তা দেশের জনগণের অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধনে যথেষ্ট।’ তিনি বাংলাদেশের জনগণকে তাঁতের কাপড় জনপ্রিয় করে তোলার আহ্বান জানান। কারণ, এতে কুটির শিল্প উন্নয়নে সহায়ক হবে। তিনি হুঁশিয়ার করে দেন যে, তার সরকার দুর্নীতি বরদাস্ত করবে না। অসৎ উপায় গ্রহণ করলে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।

জহির রায়হান এখনও বেঁচে আছেন কি?

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান গত পাঁচ দিন ধরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। বহু চেষ্টা করেও তার পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেননি, তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা। জহির রায়হান বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ চিত্র পরিচালক, খ্যাতনামা প্রযোজক ও কথাশিল্পী। তিনি বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিশন কমিটির আহ্বায়ক। দুই দিন আগে তারই অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক ও দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক  শহীদুল্লা কায়সার কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।’

কোনও এক সূত্র থেকে অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে কোনও একটি বিশেষ বাড়িতে এখনও আটক আছেন— এমন একটি সংবাদ পেয়ে জহির রায়হান ২৯ জানুয়ারি সকালে মিরপুরে যান। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট এবং তার দুই চাচাতো ভাই বাবলু ও শাহরিয়ার,শ্যালক আব্দুল হক ও  শহীদুল্লাহ কায়সারের দুই শ্যালক নিজাম ও পারভেজ। জহির রায়হান তার নিজস্ব টয়োটা গাড়ি নিজেই চালিয়ে যান। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও তিনি বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা চিন্তিত হয়ে ওঠেন। এদিকে দৈনিক বাংলার দাবি, রায়হান পরিবারের বিশেষ অনুরোধে গত চার দিন ঢাকার পত্রিকাগুলোতে এই সংবাদ পরিবেশিত হয়নি।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ