ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা রক্ষা পাবে কীভাবে?

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১৫:০১, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১০, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০

পাঠ নিচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা (ফাইল ছবি)

একুশ মানে ভাষার অধিকার, পৃথিবীর সব জাতির নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার। কিন্তু সব জাতিসত্তার ভাষার স্বকীয়তা কী ঠিকঠাক বজায় থাকছে? মনে হয় না। আমাদের দেশেই অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা। কিন্তু একুশের চেতনাকে সমুন্নত করতে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা অটুট রাখতে সব জাতির মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নিজস্ব ভাষা থাকলেও সেগুলো এখন অনেক সীমাবদ্ধতার মুখে। এসব জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মকে মূলস্রোতে প্রবেশ করতে হলে এমন ভাষা শিখতে হচ্ছে যার সঙ্গে তাদের নিজস্ব ভাষার কোনও মিল নেই। এভাবে নিজেদের ভাষা থেকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছেন তারা। রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব ভাষা সংরক্ষণের খুব একটা উদ্যোগ নেই বললেই চলে। তবে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও জাতিসত্তার কাছে তাদের ভাষায় মুদ্রিত বইও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যদিও নিজস্ব ভাষায় প্রকাশিত এই বইয়ের কদর একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর আর খুব একটা থাকছে না।

বাংলাদেশে বড় যে তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের মধ্যে গারোদের নিজস্ব বর্ণ নেই। তারা মাতৃভাষায় লেখার জন্য ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করে। এছাড়া চাকমা ও সাঁওতালদের নিজস্ব বর্ণ রয়েছে। তাদের মাতৃভাষায় বইও রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার পর আর এই ভাষার ব্যবহার করা হয় না।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পদক বিপুল চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে যে ১৩ জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া হোক- এটা আমাদের দাবি। পাশাপাশি সারা বাংলাদেশে ৪৫টির অধিক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের সবার নিজস্ব ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন ৫টি ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গারো, সাদ্রি, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। আমরা চাই অন্য ভাষাগুলোও সংরক্ষণ করা হোক।’

নিজেদের ভাষায় শিক্ষার ব্যাপারে বিপুল চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য এলাকার স্কুলগুলোতে গেলে শিক্ষকের অভাব বোঝা যায়। অনেক স্কুলে বইও পৌঁছায়নি। আমরা চাই সব শিশু বই পাক, পর্যাপ্ত শিক্ষক দেওয়া হোক, পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা জরুরি।’ এছাড়াও নিজেদের ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতিও চেয়েছেন তিনি।  

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষার বিষয়ে অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দাবি করে যে,  সব ভাষাকে মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সেই কথা তো বাংলাদেশে হচ্ছে না। কারণ অন্যান্যা ভাষাগুলোর কোনও স্বীকৃতি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য ৫টি ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও বাকিরা তো সেটি পায়নি। ফলে বাকিদের লেখাপড়া করতে হচ্ছে বাংলা ভাষায়। এতে করে সমস্যা হবেই। অনেক শিশুই ঝরে পড়ছে। ঝরে পড়ার দুটো প্রধান কারণের একটা হচ্ছে দারিদ্র্য, অন্যটি হচ্ছে মাতৃভাষায় শিক্ষা।

মাতৃভাষায় প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা জরুরি উল্লেখ করে মেজবাহ কামাল বলেন, ‘নিজের ভাষার মাধ্যমে একজন মানুষ শিক্ষাটা অনুধাবন করতে পারবে। এরপর সে বাংলা ভাষা পড়লে সেটা তার পক্ষে বোঝা সহজ হবে। যতদিন ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসহ অন্য জাতিগুলোর ভাষার মর্যাদা না দেওয়া হবে, ততদিন এসব শুধু শ্লোগানই হবে, কার্যকর কিছু হবে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর দে বলেন, ‘প্রথমত যে পদ্ধতি আমরা অন্য জাতিগুলোর শিক্ষার ব্যবস্থা করছি, তা সঠিক নয়। আমরা ভাষা সংরক্ষণের কথা বলছি। তাদের যে ভাষা, তা নানা দিক থেকেই দুর্বল। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের অনেকেরই নিজেদের লিপি বা বর্ণ নেই। এই সংকট আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু শিক্ষা দিলেই হবে না। তাদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মেসবাহুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৫টি ভাষার মধ্যে ৩টি ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা আমরা করেছি। ত্রিপুরা, মারমা এবং চাকমা। এতে তারা সহজেই প্রাথমিক শিক্ষা বুঝতে পারছে। প্রথম দিকে বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থা হলে তারা অনেকেই অনুধাবন করতে পারছে না। ড্রপ আউট হচ্ছিলো। সেজন্যই সরকার থেকে তাদের নিজেদের ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পড়াশুনা থেকে ঝরে পড়ার আরও কারণ আছে। সেগুলোও চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই। সেটা একদিনে সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে আমরা কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাবে। একটা সময় এসে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সবাই তাদের নিজেদের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পাবে বলে আশা করছি।'

 

/এএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ