সরকারি পাটকল আধুনিক হবে কবে?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৯:১২, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৮, জুলাই ১৪, ২০২০

পাটকল (ছবি: রাজশাহী প্রতিনিধি)বন্ধ করে দেওয়া সরকারি পাটকলগুলো কবে নাগাদ আধুনিক হবে, কবে নাগাদ সেই পাটকলগুলোতে বর্তমানে বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকরা নিয়োগ পাবেন, কবে নাগাদ শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে সুখের সন্ধান পাবেন, এমন জিজ্ঞাসা সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া ডেমরার সরকারি পাটকল লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক আব্দুল কাদেরের।

জানতে চাইলে পাটকলের বেকার হয়ে যাওয়া একাধিক শ্রমিক জানান, জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আবার তাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। তবে এই শুরুটা তারা করতে পারবেন কিনা বা পারলেও কতটুকু সফল হবেন, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে তাদের। তাদের প্রশ্ন, এখনও তো পাওনাই পরিশোধ হলো না, কবে নাগাদ এসব পাটকল আধুনিক হবে, আর কবে চালু হবে, আর কবে সেখানে তাদের কাজ জুটবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই দিন কাটছে বেকার পাটকল শ্রমিকদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মুহূর্তে চলছে বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি পাটকলগুলোর শ্রমিকদের দেনা-পাওনার হিসাবের কাজ। এর জন্য গঠিত কমিটি কাজ করছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবসরে দেওয়া ২৫ হাজার শ্রমিকের হিসাব করে তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে কমপক্ষে সময় লাগবে ২ থেকে আড়াই মাস। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের পর শুরু হবে বন্ধ করে দেওয়া পাটকলগুলোর সম্পদের জরিপ কাজ। এরপরই শুরু হবে পাটকলগুলো পিপিপির আওতায় দেওয়ার কার্যক্রম।

তবে এর আগে বিদ্যমান পিপিপি নীতিমালার পাশাপাশি পাটকলগুলোকে পিপিপির আওতায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, বিজেএমসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বন্ধ করে দেওয়া ২৫টি পাটকল যেসব জেলায় অবস্থিত, সেসব জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব পাটকলের সম্পত্তির হিসাব সংরক্ষণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ কাজের সঙ্গে বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও রয়েছেন। পাটকলগুলোর জমির সীমানা নির্ধারণ ও সম্পত্তির হিসাব চূড়ান্ত করার পর সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পাটকলগুলো ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় সরকার। এ সময় কাজ করতে আগ্রহী পাটকল শ্রমিকদের আধুনিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।

তবে এসব প্রক্রিয়া শেষ করে মিলগুলো চালু করতে কমপক্ষে বছরখানেক সময় লাগবে। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে এসব মিল আবার চালু হবে।
এদিকে গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, নতুন আঙ্গিকে পাটকলগুলো চালু হলে অভিজ্ঞ কর্মীদেরই সেখানে চাকরি হবে, এজন্য তাদের আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য পাট হচ্ছে একটা বিকল্প। যেহেতু সিনথেটিক থেকে সবাই এখন মুক্তি চায়। এজন্যই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে, আধুনিক করতে হবে, নতুন করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে শ্রমিকদের জুন মাসের বেতন ভাতা পরিশোধ করতে ৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এছাড়াও আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ হাজার শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের জন্য। একজন শ্রমিক যা পাবেন তা হিসাব করে অর্ধেকটা নগদ আর অর্ধেকটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধ করে তাদের হাতে দেওয়া হবে। নগদ টাকা পেলে খরচ করে ফেলবে বিধায় সরকার এ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

এদিকে সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) নেতৃবৃন্দ। তারা পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। নেতারা বলেন, করোনা দুর্যোগে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যেকোনও সিদ্ধান্ত শ্রমিকের জীবনকে বিপন্ন করে তুলবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার পাটকলগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প হিসাবে ঘোষণা করে। এর আগে এই ভূখণ্ডে পাটশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে বাওয়ানি জুটমিল স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সেই বছরের ১২ ডিসেম্বর ২৯৭ একর জায়গা আর তিন হাজার ৩০০ তাঁত নিয়ে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল স্থাপন করেন আদমজীরা তিন ভাই। নাম দেন আদমজী জুটমিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৫টি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘পিও ২৭’ (বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস ন্যাশনালাইজেশন অর্ডার ১৯৭২) অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ‘ইপিআইডিসি’র মোট ৬৭টি পাটকলের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন গঠিত হয়। ১৯৮১ সালে এর নিয়ন্ত্রণাধীন মিলের সংখ্যা ছিল ৮২। ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে ‘অজগর’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করা হয় আদমজী জুটমিল। পাটশিল্পকে ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’ আখ্যা দিলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে হতে বর্তমানে বিজিএমসির পাটকলের সংখ্যা ৩২। এরমধ্যে চালু রয়েছে ২৫টি, মামলা এবং বিচারাধীন ৫টি, ১টি নিয়ে বিক্রয়োত্তর মামলা রয়েছে, একটিতে ভিসকস উৎপাদন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

তবে রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ হলেও দেশে বাড়ছে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা। বর্তমানে দেশে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮৫। মিলগুলোতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২ লাখেরও বেশি।

জানা গেছে, দেশে পাট চাষের জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার একর। এসব জমিতে পাট উৎপাদন হয় ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন। এরমধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে ব্যবহার হয় ১১ লাখ টনেরও বেশি। বাকিটা রফতানি করা হয়। কাঁচাপাট গড়ে প্রতি বছর রফতানি হয় ২ দশমিক ৫ লাখ টন, যার মূল্য প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। পাটপণ্যের গড় উৎপাদন ১০ লাখ ৫০ হাজার টন, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার এক লাখ ৫০ হাজার টনের মতো। আর বাকি প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন পাটজাত দ্রব্য রফতানি হয়, যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ জানিয়েছেন, বন্ধ করে দেওয়া সরকারি পাটকলগুলোকে পিপিপির আওতায় চালু করতে বেশ কিছু কাজ আছে। সেই কাজগুলো একের পর এক শেষ করতে হবে।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, কোনও পাটকলই বন্ধ করা হয়নি। এই মুহূর্তে কারখানাগুলোয় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকদের অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাওনা পরিশোধের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিকমতো শেষ হলে পাটশিল্পের জন্য সোনালি দিন অপেক্ষা করছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ