সেই পঁচাত্তর

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০০:৩৮, আগস্ট ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩৫, আগস্ট ০২, ২০২০

৭ তারিখ ডেইলি অবজারভারবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ এর আগস্টে সপরিবারে হত্যা করার মাসে বাংলাদেশ ছিল অনেক চুক্তি, নতুন নতুন ফোরামে যুক্ত হওয়া,আর পরিণত এক রাষ্ট্রের পথে হেঁটে চলা দেশ। আর এর নেতা বঙ্গবন্ধুর ছিল সারাক্ষণ আরও  বেশি জনতার সম্পৃক্ততা, আরও বেশি করে সোনার বাংলা গড়ার আকাঙ্ক্ষার জন্য লড়াই।  কিন্তু দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া দেশের পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়— শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর চারপাশে চোরাচালানকারী ও মজুতদারদের উপস্থিতি। একের পর এক দুর্নীতি আর দেশকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের হাতছানি। ডেইলি অবজারভার, দৈনিক বাংলা  ও ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে সেই পঁচাত্তরের আগস্টের ‍শুরুটা কেমন ছিল?

৩ আগস্ট দৈনিক বাংলা কর্তব্য নিষ্ঠায় মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু

চারপাশে এত দুর্নীতি, এত রকমের বাধার মুখেও বঙ্গবন্ধু তার দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে মুগ্ধতায় ডুবে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিত্যদিনের মতো সন্ধ্যাবেলায় গণভবন এলাকায় পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ তার দৃষ্টি পরে কেবিনেট ডিভিশনের একটি কক্ষে। ছুটির দিনে সেখানে মৃদু আলো জ্বলছিল। বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যান। তিনি দেখতে পান— এক লোক একাগ্রচিত্তে কাজ করছেন। তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, সেই ব্যক্তি একজন সাধারণ কর্মচারী— নাম আব্দুল জলিল। অনেক জরুরি কাজ থাকায় ছুটির দিনে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা কাজ করছেন। আরও  জানতে পারেন যে, অতিরিক্ত খরচ না হয় সেজন্য তিনি দুটো বাল্বের একটি জ্বালিয়েছেন এবং পাখা না চালিয়ে জানালা খুলে দিয়ে, খালি গায়ে বাইরে থেকে আসা বাতাসে কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধু তার কর্তব্যনিষ্ঠায় খুশি হন এবং তার পদোন্নতির নির্দেশ দেন ও তাকে নগদ ৫শ’ টাকা পুরস্কার দেন। খবরটি ১৯৭৫ সালের ৩ আগস্টের  পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।

৫ তারিখের দৈনিক বাঙলার লীডস্টোরিতে খন্দকার মোশতাকআন্তর্জাতিক নানা কর্মকাণ্ড

আগস্টের শুরুতেই উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ইয়াং হিয়ং সপের বাংলাদেশ সফর ছিল আলোচনায়। তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাসসের খবরে প্রকাশ— তিনি বঙ্গবন্ধুকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন। বৈঠকে প্রতিনিধি দলের অন্যান্য সদস্য ও ঢাকায় উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স উপস্থিতি ছিলেন। এদিকে ইয়াং হিয়ং সপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার উন্নয়নের প্রশ্নে আলোচনা করেন। বাসসের খবরে প্রকাশ— বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সাধারণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা ব্যবসা ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করেন। ইয়াং হিয়ং সপ  বলেন, ‘একটি বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে তারা নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে পরে প্রতিনিধি বিনিময় হবে।’

আগস্টের প্রথম দিনে তথ্য ও বেতারমন্ত্রী কোরবান আলী বলেন, ‘শত শত বছরের সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের জনসাধারণের মাঝে ঘনিষ্ঠ মৈত্রীর বন্ধন গড়ে উঠেছে এবং এই সম্পর্ক দিনে দিনে আরও ঘনিষ্ঠ হবে। শনিবার (১ আগস্ট ) সন্ধ্যায় ঢাকায় আয়োজিত বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সমিতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে  সম্মানিত অতিথির ভাষণে  তিনি এই কথা বলেন।

ইত্তেফাক ৫ আগস্টজার্মানির সঙ্গে ঋণের একটি বিষয়েও আগস্টের শুরুতেই আলাপ এগোয়। আশুগঞ্জে নির্মাণাধীন দেশের বৃহত্তম সার কারখানার জন্য পশ্চিম জার্মানি বাংলাদেশকে নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসাবে তিন কোটি জার্মান মার্ক (১৫ কোটি টাকা) ঋণ দেবে। এবিষয়ে দুদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিতও হয়।দৈনিক বাংলা ২ আগস্ট

চলছিল ‍দুর্নীতি আর  লুটতরাজ

সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর আপ্রাণ প্রচেষ্টাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছিল দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষ। বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই তার নানা বক্তৃতায় এই ধরনের লোকদের থেকে সতর্ক থাকতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৭৫ এর আগস্টের শুরুতে সামনে আসে ৩২ লাখ টাকার সুতা কেলেঙ্কারির ঘটনা, ধরা পড়ে বিসিকের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দুর্নীতি দমন সংস্থা এই চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি দুটি উদঘাটন করে এবং পাঁচটি পৃথক মামলায় পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য একটি খবর প্রকাশিত হয় ৪ জুলাই ১৯৭৫। এবার ইট মজুতদারি। প্রতিবেদনে বলা হয়— অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এবার ইট মজুত করছে ব্যবসায়ীরা। পহেলা জুলাই থেকে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকে এই মজুতদারি শুরু হয় বলে জানা যায়।  পরের বছর ডিসেম্বর নাগাদ ইটের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হলে দাম আরও বাড়বে। এই ধারণার ভিত্তিতে এখন থেকেই মজুতদারি শুরু হয়েছে।

এদিকে ৫ আগস্ট প্রধান প্রধান পত্রিকাগুলোর লিড স্টোরিতে জায়গা পান— বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এশীয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ কয়েকটি পণ্য সম্পর্কে সম্ভবত পূর্বাঞ্চলের আটটি দেশের সঙ্গে রহিতকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার যেকোনও দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত রয়েছে। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।’ ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

৫ আগস্ট আসে প্রথম বড় ধরনের সুখবর, যেখানে বলা হয়— চলতি অর্থবছরের সূচনাতে আন্তর্জাতিক পাটজাত দ্রব্যের বাজারে বাংলাদেশের আধিপত্য বিস্তারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। পাট শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, ১৯৭৫/৭৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পাট বাণিজ্য ও শিল্প খাত গৌরব ফিরে পাবে।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ