অধিভুক্ত ৭ কলেজে সেশনজট:মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে, মায়ের এখনও শেষ হলো না ডিগ্রি

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল
প্রকাশিত : ১৭:০১, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৯, অক্টোবর ৩০, ২০২০

ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত ইডেন মহিলা কলেজের ডিগ্রিতে পড়ছেন মারিয়া। দীর্ঘ সেশনজটে পড়ে ৯ বছরেও শেষ করতে পারেননি তিন বছরের ডিগ্রি এবং দুই বছরের মাস্টার্স কোর্স। অথচ তার মেয়ে এখন জেএসসি’র পরীক্ষার্থী। শুধু মারিয়া নয়, এভাবে সাত কলেজের পুরো ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছে দীর্ঘ সেশনজটে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার জন্যই সেশনজট তৈরি হয়েছে। ফলে চাকরির অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও পারিবারিক চাপসহ নানা সমস্যায় মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন তারা।

মারিয়া ২০১২-১৩ সেশনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিন বছরের ডিগ্রি এবং দুই বছরের মাস্টার্স  (৩+২) কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। দীর্ঘ সেশনজট অতিক্রম করে ২০১৫ সালে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দেন তিনি। নিয়মিত পরীক্ষা হলে এ সময় তিনি থাকতেন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। এরইমধ্যে মানোন্নয়নের জন্য ২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়৷ এরপর একই বছরের নভেম্বরে ঢাবি কর্তৃপক্ষ ডিগ্রি পাস কোর্সের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শুরু করে, যা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। এরপর দীর্ঘ ৯ মাসেও ফল প্রকাশ হয়নি।

অবশেষে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—প্রকাশিত ফলাফলে ছিল চরম বিপর্যয়। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মানোন্নয়ন  পরীক্ষার নম্বর, ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর যোগ হয়নি এবং গড়ে পাস না দেওয়ায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হন। এরপর একাধিকবার শিক্ষার্থীরা ফল সংশোধনের জন্য চেষ্টা করেও পুরোপুরি সংশোধন করতে পারেননি।

এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ফল সংশোধন করতে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। কেবল যারা টাকা দিয়েছেন, তাদের ফল সংশোধন করা হয়েছে। ফল সংশোধন করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরী অনেকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ তাদের। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রিতে পড়েন বলে হেয় করে কথা বলারও অভিযোগ আছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে।

এরপর ২০১৯ সালের ২৪ এবং ২৫ মার্চ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল দ্রুত সংশোধন এবং অকৃতকার্য বিষয়ে দ্রুত পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘ সেশনজট বিবেচনায় নিয়ে সেশন ধরে রাখতে প্রিলি মাস্টার্সে ভর্তির জন্য আন্দোলন করেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো.  আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করার নির্দেশ দেন এবং শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়েই প্রিলি মাস্টার্সে ভর্তির জন্য অনুমতি দেন। যদিও ঢাবির নিয়ম ছিল—অকৃতকার্যরা প্রিলি মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারবেন না। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য এ অনুমতি দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা প্রিলি মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে ক্লাসও করেন। ভর্তি হতে ৫ হাজার টাকা করে দেন তারা। এরইমধ্যে প্রিলি মাস্টার্সের ফরম পূরণের কাজ শুরু হয়। তখন শিক্ষার্থীরা ফরম পূরণ করেন। তখন ঢাবি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়—তৃতীয় বর্ষে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা প্রিলি মাস্টার্সের প্রথম ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। এরপর শিক্ষার্থীরা স্ব-স্ব কলেজ এবং ঢাবি কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানালে ৬ মাসব্যাপী একটি রুটিন প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য তাদের সব পরীক্ষা শেষ হয়নি। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে বলে জানান তারা।

ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে ঢাবি এবং সাত কলেজের দায়িত্ব থাকা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে অনেক অপমানিত হয়েছি। কোনও সমাধান খুঁজে পাইনি। ডিগ্রিতে যখন ভর্তি হই, তখন আমার মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়তো, আর এখন সে জেএসসি পরীক্ষার্থী।অথচ এত দীর্ঘ সময় সেশনজটে থাকায় আমি ডিগ্রি শেষ করতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘কোনও নিয়োগ পরীক্ষায়ও আবেদন করতে পারছি না। আমাদের সঙ্গে অনেকেই ভীষণ কষ্টে টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন। সব বিষয় নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে রয়েছি।’

জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি তৃতীয় কোর্সের কয়েকটি পরীক্ষা করোনা পরিস্থিতির জন্য অসম্পন্ন রয়েছে। সেগুলো নেওয়ার জন্য খুব শিগগিরই আন্দোলনে যাবেন বলে জানান সাত অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি আলোচনা সভা ডেকেছেন  তারা।

সরকারি তিতুমীর কলেজের বিএসএস কোর্সের শিক্ষার্থী ওয়ালি উল্লাহ আহমেদ টিটু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ডিগ্রি ২০১২-১৩ ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলাম।  ২০১৬ সালে  ডিগ্রি শেষ করে আমাদের  বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৯ বছরেও ডিগ্রি শেষ করতে পারিনি। এখনও ঢাবির অধীনে  ঝুলে আছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সাত কলেজের সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে আগামী ৩ এবং ৪ নভেম্বর একটি মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হবে।

এ বিষয়ে জানতে কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও সরকারি সাত কলেজের সমন্বয়ক (ফোকাল পয়েন্ট) অধ্যাপক ড.  আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকারের ফোনে  একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরীর কাছে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনও জবাব না দিয়ে বরং  তাকে ফোন করতে নিষেধ করেন এবং ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এর পরপরই এ প্রতিবেদকের কাছে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের এক কর্মকর্তা ফোন করে জানান যে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হককে  ‘স্যার’ না বলে ‘ভাই’ সম্বোধন করায় তিনি একটু রাগ করেছেন। সে জন্য তিনি ফোন কেটে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাত কলেজের সমস্যার জন্য অনুষদের ডিন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রয়েছেন। তারাই ভালো বলতে পারবেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক এ বিষয়ে  মন্তব্য না করার বিষয়টি উপাচার্যকে জানালে তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কেন তিনি (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) মন্তব্য করবেন না?’ উপাচার্য পরীক্ষার বিষয়ে খোঁজ নেবেন বলে জানান।

প্রসঙ্গত, ২৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজেও সেশনজটের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটাকে সহনশীল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পথ খুঁজছে। অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করবে কর্তৃপক্ষ।

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ