জাতীয়করণ করা কলেজগুলোর শিক্ষকদের ক্যাডার মর্যাদা দেওয়ার বিরোধিতা করে রবিবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা। দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাডার, নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ দাবির পক্ষে অনড় থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি শুরু হওয়ায় সেশন জটও প্রকট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিসিএস শিক্ষকদের দাবি, আন্দোলনটিতে শিক্ষকদের স্বার্থের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্বার্থও জড়িত।
বিসিএস শিক্ষকদের দাবি, জাতীয়করণ করা কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার মর্যাদা দেওয়া যাবে না। কিন্তু সদ্য জাতীয়করণ করা কলেজ শিক্ষকদের দাবি, নিয়মানুযায়ী তাদের ক্যাডার মর্যাদা দিতে হবে।
জাতীয়করণ করা কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত না করার দাবিতে রবিবার ও সোমবার কর্মবিরতি পালন করছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষকরা। দাবি না মানলে তিন দিনের কর্মবিরতির কর্মসূচিসহ আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। কিন্তু এ কর্মবিরতির কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজ নোটিশ দিয়ে জানিয়েছে এই দু’দিনের সব পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাবি প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এই দুই দিনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষ (বিশেষ) এবং ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা ছিল। যা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। আবার ঢাবি অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজের ২০১৬ সালের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা এবং ২০১৬ সালের স্নাতক প্রথম বর্ষ ডিগ্রি (পাস) ও সার্টিফিকেট কোর্সের পরীক্ষা ছিল। এটিও স্থগিত করা হয়েছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, এক সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রচুর সেশনজট ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেশনজট কমতে শুরু করেছে। এখন যদি শিক্ষকরা নিজেরাই তাদের নিজেদের স্বার্থে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখেন, তাহলে আবার সেশনজট বাড়বে।
নিজেদের আন্দোলন প্রসঙ্গে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ্ খন্দকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘দেশে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি ক্যাডারভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। এবার ২৮৩টি কলেজ জাতীয়করণ হওয়ার পর আরও প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষক ক্যাডারভুক্ত হবেন। এর আগেও এভাবেই কলেজ জাতীয়করণের পর শিক্ষকরা ক্যাডারের মর্যাদা পেয়েছেন। আমরা প্রতিবাদ করলেও লাভ হয়নি। তবে এবার আন্দোলনটা জোরালো হবে।’
তিনি আরও বলেন,‘কলেজ জাতীয়করণ হোক তাতে আমাদের কোনও সমস্যা নেই। তাদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা আমাদের মতো দিলেও আপত্তি নেই। আমাদের দাবি,ওইসব শিক্ষককে নন-ক্যাডার মর্যাদায় রাখতে হবে,তাদের বদলি করা যাবে না এবং পদোন্নতির পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।’ এ দাবি মেনে নেওয়া না হলে ৬,৭ ও ৮ জানুয়ারি ফের কর্মবিরতিতে যাবেন ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা। এর মধ্যে দাবি না মানলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্বার্থও জড়িত। কারণ, যাদের কোনও কোয়ালিটি নেই তারা কলেজ জাতীয়করণের সঙ্গে সঙ্গে বিসিএস ক্যাডার মর্যাদা পাবেন। তারা তো এই ক্যাডারভুক্ত হওয়ার যোগ্য নন। তারা কিভাবে শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষা দেবেন? তাদের বিসিএস মর্যাদা দিলে শিক্ষার্থীরা সারাজীবনের জন্য ভুক্তভোগী হবেন।’
অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ্ খন্দকার আরও বলেন, ‘আমরা সরকারি কলেজগুলো সপ্তাহে ৬ দিন খোলা রেখে ক্লাস নিই। কিন্তু বেসরকারি কলেজগুলো দুদিন বন্ধ রাখে। এ হিসেবে আমরা শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন বেশি ক্লাস নিই। সেখানে মাত্র দুদিন ক্লাস বন্ধ রাখায় (আন্দোলনের সময়) খুব একটা সমস্যা হবে না। তাছাড়া, তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে আমরা বাড়তি ক্লাস নেবো।’
গত এপ্রিলে ২৮৩টি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় জাতীয়করণ করা কলেজের শিক্ষকরা ক্যাডারের মর্যাদা পাচ্ছেন। শুরু থেকেই বিসিএস শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে এবারই আন্দোলনটি জোরালো হয়েছে।
আর জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের দাবি,আগের নিয়মেই তাদের ক্যাডার মর্যাদা দিতে হবে। অন্যথায় আইনের আশ্রয় নেবেন তারা। এ বিষয়ে জাতীয়করণ করা কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন,‘১৯৭৮ সাল থেকে কলেজ জাতীয়করণ হচ্ছে। এতদিন ক্যাডার হিসেবেই নিয়োগ পেয়ে আসছেন সবাই। এখন যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হয় তাহলে আমরা আইনের আশ্রয় নেবো।’
এদিকে, বিসিএস শিক্ষক ও জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের এমন জটিলতার সমাধান কিভাবে হবে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওহিদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মসূচি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত যারা করছেন, তারাই এর দায় নেবেন। সরকার দায় নেবে না কারণ, কর্মসূচি সরকার দেয়নি। তবে তাদের যে দাবি, সে বিষয়ে আমার কোনও মন্তব্য নেই। বিষয়টি নিয়ে সরকার কী করবে সে ব্যাপার আমার কিছু জানা নেই।’







