বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) অধিভুক্ত ও জামালপুরের মেলান্দহে অবস্থিত ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফিশারিজ কলেজকে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণ করে সংসদে বিল পাস হলেও উপাচার্য নিয়োগ না হওয়ায় শুরু হচ্ছে না এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড। গত ২১ জুন একজন অধ্যাপক উপাচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সুপারিশ করলেও রহস্যজনক কারণে তিনি যোগদান করেননি। এরপর একাধিক প্যানেল গঠন করা হলেও তা বাতিল হয়ে যাচ্ছে রহস্যজনক কারণেই। এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে, ঘোষণা দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু না হওয়ায় পরিচয় সংকটে পড়ে ঢাকায় এসে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়,২০০০ সালে বাকৃবি’র অধিভুক্ত হয়ে কার্যক্রম শুরু করে জামালপুরের মেলান্দহে অবস্থিত ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফিশারিজ কলেজ। ১৭ বছর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর গত বছরের ২০ নভেম্বর এই কলেজটির নাম পাল্টে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে বিল পাস হয় সংসদে। নিয়মানুযায়ী একজন উপাচার্য যোগদানের পরই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়টি তার কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। কিন্তু, বিল পাসের পরও উপাচার্য নিয়োগ না দেওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আন্দোলনে নামেন এর শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস আন্দোলনের পর গত ২১ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণু জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিরঞ্জন কুমার সানাকে উপাচার্য হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যোগদানের আগেই অপারগতা প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। আবার যেদিন অপারগতা প্রকাশ করেন, তার দাবি অনুযায়ী এর পরদিনই আরেকটি চিঠি দিয়ে সেখানে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবার, উপাচার্য নিয়োগে যে তিন অধ্যাপকের প্যানেল গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠানো হয় সে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন ড. নিরঞ্জন কুমার সানা। তার আগ্রহ-অনাগ্রহের কারণে তিনি এখন বিবেচনার বাইরে, বিশেষ কোনও কারণে তালিকার প্রথম জনকে বিবেচনায় নেননি রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়টির আচার্য, আর তালিকার তৃতীয় জনও অপারগতা প্রকাশ করেছেন। ফলে এখনও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও উপাচার্যকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কলেজ নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় পাচ্ছেন এই নিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্য যোগদান করলেই বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু হবে। উপাচার্য নিয়োগ পেলে তিনি সিন্ডিকেট গঠন করবেন, বাজেটের জন্য আবেদন করবেন, একাডেমিক ভবন নির্মাণ করবেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ অন্যান্যদের নিয়োগ দেবেন। কিন্তু উপাচার্য যোগদান না করাতেই সব আটকে আছে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির একদিন পরেই সেখানে যোগদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন নিরঞ্জন কুমার সানা। এরপর তার বদলে এখনও নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘নিরঞ্জন কুমার সানা যোগদানে অপারগতা জানানোর পর তৃতীয় জন আসাবুল হককে নিয়োগের সুপারিশ পাঠানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে সেটাও বাতিল হয়ে যায়। পরে সেই প্যানেলটি বাদ দেওয়ার পর আরও একটি প্যানেল নিয়ে কাজ চলছে। সেটাও এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। কারণ এ নিয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একাধিক বার প্যানেল পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,‘বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্য নিয়োগের জন্য যাচাই বাছাই করে তিন সদস্যের একটি প্যানেল করা হয়। এ প্যানেলের প্রথম স্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান,দ্বিতীয় স্থানে প্রাণ রসায়ন ও অণু জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিরঞ্জন কুমার সানা এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আসাবুল হক কে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়। পরে সেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে যাচাই বাছাই শেষে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নির্দিষ্ট করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ড. নিরঞ্জন কুমার সানাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এর একদিন পরই মন্ত্রণালয় তার যোগাদানে অস্বীকৃতির চিঠি পায়।
শিক্ষার্থীদের দাবি,উপাচার্য না থাকায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জামালপুর থেকে এসে গত রবিবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকশ’ শিক্ষার্থী। এদিন তারা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে স্মারকলিপিও পেশ করেছে।
এদিকে ফজিলাতুন্নেছা ফিশারিজ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাংলা ট্রিবিউনের কাছে অভিযোগ করেন,নিরঞ্জন কুমার সানা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ পাওয়ার পর স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা তাকে যোগদান না করার জন্য হুমকি-ধমকি দেন। কারণ,ওই প্যানেলের প্রথমজন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান জামালপুর অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় তাকেই উপাচার্য হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন ওই নেতা। এরপর ওই নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঞ্জন কুমার সানার কাছে লোক পাঠান। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করবেন না উল্লেখ করে একটি চিঠি লিখতে তাকে বাধ্য করানো হয়। তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এরপর তার স্বাক্ষর গ্রহণ করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এ বিষয়ে জানতে পারলে তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিরঞ্জন কুমার সানাকে অভয় দেন এবং যোগদানের জন্য অনুরোধ করলে তিনি যোগদান করতে ইচ্ছা পোষণ করে আবার চিঠি পাঠান। এরপরও তিনি যোগদান করেননি।‘
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরঞ্জন কুমার সানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমি যোগদান করতে চাই না বলে একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে গেছে। কিন্তু এর একদিন পরই আমি আবার একটি চিঠি পাঠিয়ে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করি। চিঠিটি মন্ত্রণালয়ের নথিভুক্তও হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু এরপর আমি ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আর কোনও উত্তর পাইনি।’
প্রথমবার কেন যোগদান করতে চাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘আমি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় ছিলাম। এ কারণে যোগদান করতে চাইনি। অন্য কোনও কারণ নেই।’
এদিকে,কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষ শহিদুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ঝুলে আছে অনেকদিন থেকে। মূলত উপাচার্য নিয়োগ না হওয়ায় এই সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অনেক সমস্যায় রয়েছে। তাদের লেখাপড়ার ব্যাঘাত হচ্ছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি বাকৃবির অধিভুক্ত,তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী শিক্ষার্থীদেরকে ৭৪ কিলো মিটার দুরে অবস্থিত বাকৃবিতে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। এখানে আমরা যারা শিক্ষকতা করছি তারাও দোটানার মধ্যে রয়েছি।‘
তিনি আরও বলেন,‘আমার বয়স হয়েছে। আমার অবসরে যাওয়ার কথা। ইতোমধ্যে আমি পদত্যাগ করতে চেয়েছি কিন্তু,গভর্নমেন্ট বডি এটা গ্রহণ করছে না। কারণ, তারা বলছে উপাচার্য না আসা পর্যন্ত যেন আমি একটু ঠেকিয়ে দেই। কিন্তু, উপাচার্য আসছেন না। এলে আমি রেহাই পেতাম।‘
উপাচার্য নিয়োগের জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,’নিরঞ্জন কুমার সানাকে যোগদান করতে বলা হলে তিনি যোগদান করেন নি। আমি যতদূর জানি, নিরঞ্জন কুমার সানা যোগদান না করায় প্যানেলের তৃতীয়জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার আগেই তিনি যোগদানে অপারগতা স্বীকার করেছিলেন।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আসাবুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যতদূর জানি, নিরঞ্জন কুমার সানাকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি যোগদান করেননি। পরে আমাকে নিয়োগের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’
এদিকে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উপাচার্য প্যানেল ও নিয়োগ সংক্রান্ত আমার কোনও তথ্য জানা নেই।’
জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বেলায়েত হোসেন তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিল পাস হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। একজনকে প্রথমে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের জন্য বলাও হয়েছিল। কিন্তু তিনি যোগদান করেননি। এরপর আরও একবার প্যানেল গঠন হয়েছে। সেগুলোতেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একটি প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগের জন্য সুপারিশের অপেক্ষায় আছে। খুব দ্রুতই হয়ত সমস্যার সমাধান হবে।’








