তিন দিনের আকাশপাতাল ভেঙে যাওয়া চেহারা, চোখের পানি শেষ হয় না যেন। মুখে কেবল একই কথা— ‘ভ্যান চাই না, খাবার চাই না, আল্লাহ আমার পোলারে বুকে ফেরাইয়া দেউক’, বলছিলেন দুর্বৃত্তদের কোপে গুরুতর আহত কিশোর ভ্যানচালক শাহীনের মা খাদিজা বেগম।
২৮ জুন নিজের ভাত নিজে নিয়ে, মরিচ পুড়িয়ে খেয়ে বের হওয়া ছেলে প্রায় নিথর পড়ে আছে, হাসপাতালে। মা জানেন না ছেলে আর কোনোদিন সুস্থ হয়ে ফিরবেন কিনা। মা জানেন না তার ছেলে এখন কী ভাবছেন।
শুক্রবার (২৮ জুন) সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানার ধান দিয়ায় যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তের কোপে গুরুতর আহত হন শাহীন।
ঘটনার পর তাকে খুলনায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। টানা ৩০ ঘণ্টা খুলনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরও অবস্থার কোনও উন্নতি না হওয়ায়, শনিবার (২৯ জুন) তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
সেই মা সেদিনের কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি বলেন ‘কাল সাতটায় (গত শুক্রবার সকালে) আমারে কইলো আম্মু ভাত দাও। তখনও তরকারি হয় নাই দেখে আমি দেরি করতে বলি। সে তাড়াহুড়ো করে। একটা শুকনা মরিচ কাঠিতে গাইথা আগুনে পোড়াইলো, আর সঙ্গে হলুদ গুড়া নিয়ে ভাত মাখছিল, কিন্তু খাইতে পারে নাই। বাইর হয়ে গেছে।’
শাহিনের মা চোখ মোছেন আর বলেন, ‘আমি ভ্যান, মোবাইল কিচ্ছু চাই না, কেবল আমার পোলারে চাই, আল্লাহ আমার পোলারে বুকে ফেরাইয়া দেউক।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিন তলার একটি ভিআইপি কেবিনে কথা হচ্ছিল শাহিনের মায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কত মানুষ যে আসছে। আমরা তাদের চিনিও না। এই যে কেবিন, প্রধানমন্ত্রী এর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মায়ের বুক খালি হবে না। যারা আমার পোলার জন্য এত কিছু করছেন, তারা শতায়ু হোন।’
কেমন আছে শাহীন? সোমবার (১ জুলাই) স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তাকে দেখে এসে জানান, ‘শাহীন এখন ভালো আছে, তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়েছে। তার ওষুধপত্র ও চিকিৎসায় যা যা প্রয়োজন, হাসপাতাল থেকে সব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও তার দফতর থেকে লোক পাঠিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।’
শাহীনের বিষয়ে আরও জানতে চাইলে তার মা খাদিজা বেগম বলেন, ‘এলাকার একটি মাদ্রাসায় শাহীন ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে নিয়মিত ভ্যান চালায় না। সেদিন ভ্যান নিয়ে বের হয়েছে সকাল সাতটার দিকে। তারপর দুপুর ১২টার দিকে খবর পাই তারে নাকি কারা কোপাইছে।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
এক পর্যায়ে শান্ত হন খাদিজা। জানান, তাদের টানাটানির সংসার। ১৭ বছরের শাহীনরা তিন ভাই বোন। শাহীন বড়। খাদিজা গৃহকর্মীর কাজ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার অভাবের সংসারের ভ্যান নিয়ে গেছে যাক, ছেলেটা কথা বলুক, ছেলেটা সেরে উঠুক।’
প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুন যাত্রীবেশে কয়েকজন ছিনতাইকারী সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানার ধানদিয়ায় যাওয়ার কথা বলে কিশোর শাহীনের ভ্যানে ওঠে। ধানদিয়া গ্রামের পথে ঢুকে একটি পাটক্ষেতের পাশে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা শাহীনের মাথায় কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ভ্যানটি নিয়ে যায়। পরে জ্ঞান ফিরে শাহীনের চিৎকারে স্থানীয়রা পাটকেলঘাটা থানায় খবর দিলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।








