একটি এইচডিইউ বেডের সন্ধানে

শাহেদ শফিক
১০ জুলাই ২০২১, ১১:০২আপডেট : ১০ জুলাই ২০২১, ১৮:০৮

দিলারা বেগম, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মেহেরপুর জেলার সদর হাসপাতালে দুই সন্তানের এই জননী প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। তবে দুদিন আগে হঠাৎই তার অক্সিজেনের লেভেল কমে আসে। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে কোনও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) বেডে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। জেলায় কোনও ব্যবস্থা না পেয়ে রাজধানী ঢাকায় খোঁজ শুরু করেন স্বজনরা। কিন্তু করোনা মহামারির সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রাজধানীর অবস্থাওতো ভয়াবহ। রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে সরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ বেড। ফাঁকা নেই এইচডিইউ বেডও।

কূলকিনারা না পেয়ে গতরাতে অ্যাম্বুলেন্সযোগে রোগীকে নিয়ে রওনা হন রাজধানী অভিমুখে। এরই মধ্যে তারা এক চিকিৎসক স্বজনের মাধ্যমে খোঁজ পেয়েছেন, করোনারোগীদের চিকিৎসায় মাত্র আড়াই মাস আগে রাজধানীর মহাখালীতে ‘ডিএনসিসি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল’ চালু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এক হাজার শয্যার এ হাসপাতালে এরমধ্যে ৫০০ বেড সেন্ট্রাল অক্সিজেন সংযুক্ত। এই ৫০০টির মধ্যে ২১২টি বেড আইসিইউ বেড রয়েছে। বাকি ৫০০ সিলিন্ডার বেইজড এরিয়া। এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা রুম। কারণ এগুলো আগে দোকান ছিলো। প্রতিটি রুমে একজন রোগী রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়ে আজ শনিবার (১০ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে সেই হাসপাতালে হাজির হন তারা।

সকাল ৭টায় হাসপাতালে পৌঁছান তারা

‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোট সে তরী...’; অবস্থা কিছুটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ‘সোনার তরী’ কবিতার মতোই। এখানে এসেও নিরাশ হতে হয় তাদের। দায়িত্বরতরা দিলারা বেগমের স্বজনদের জানিয়ে দেন, আইসিইউ কিংবা এইচডিইউ বেড, কোনওটাই ফাঁকা নেই। এইচডিইউতে তাদের আগেই আরও দুজন সিরিয়ালে আছেন। অন্তত তিনজন রোগী রিলিজ পেলে ভর্তি হতে পারবেন দিলারা বেগম।

এদিকে রোগীর অবস্থা বেগতিক, অক্সিজেনের লেভেল নেমে এসেছে ৬০-এ। সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে তাকে অ্যাম্ব্যুলেন্সে রাখা হয়েছে। দুই সন্তানের জননী দিলারা বেগমকে তখন অ্যাম্ব্যুলেন্সের মধ্যে ছটফট করতে দেখা গছে। স্বজনরাও তার সাধ্যমতো সেবা করার চেষ্টা করছেন। মাঝে মধ্যে কান্নাকাটিও করতে দেখা গেছে। বেডের জন্য ডাক্তারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন তারা। রোগীর স্বজনরা মোবাইল ফোনে রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালেও খোঁজখবর নিচ্ছেন অনবরত। কিন্তু কোথাও কোনও বেড ফাঁকা থাকার সন্ধান পাননি।

এরই মধ্যে দিলারা বেগমকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের পাশে এসে দাঁড়ালো আরেকটি। তাতে শুয়ে আছেন এক সত্তুরোর্ধ্ব বৃদ্ধা। রাখা হয়েছে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে। অবশ্য তাদের আগে থেকেই সিরিয়াল নেওয়া। এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢোকানো হলো হাসপাতালে। তা শুধু তাকিয়ে দেখলেন দিলারা বেগমের স্বজনরা।

দিলারা বেগমের সঙ্গে এসেছেন, তার দুই বোন হোসনে আরা ও হাসনায়ারা। হোসনে আরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছয়দিন মেহেরপুর সদর হাসপাতালে ছিলাম। সেখান থেকে ডাক্তারা বলেছে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসতে। রাত ১টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ভোর ৭টায় এখানে এসে পৌঁছাই। এখন শুনছি তার (রোগী) জন্য যে ধরনের বেড দরকার সেধরনের বেড খালি নেই।

তিনি আরও বলেন, আমার একজন আত্মীয় রয়েছেন। তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালের ডাক্তার। তিনিও চেষ্টা করছেন। কোথাও ফাঁকা পাচ্ছি না। প্রাইভেটেও চেষ্টা করছি। তাতেও ফাঁকা নেই। দুই ঘণ্টার ধরে এখানে অবস্থান করছি। রোগী কষ্ট পাচ্ছে। জানি না উপরওয়ালা কপালে কী রেখেছেন!

‘উপরওয়ালা’ হয়তো হোসনে আরার কথা শুনেছেন! তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিলো এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়ে তাদের। দিলারা বেগমকে তোলা হয় ট্রলিতে। নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের ভেতরে।

2

হাসপাতালের তথ্য ও অনুসন্ধান কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসলে পরিস্থিতি তেমন একটা ভালো না। প্রতিদিন অনেক রোগী আসে। শুরুর দিকে যা রোগী আসতো এখন তার ১০ গুণ বেশি আসে। অনেক সময় সব বেড ভরে যায়। যখন কেউ মারা যায় বা রিলিজ নেন, তখন আসন ফাঁকা হয়। নানান সীমাবদ্ধতার পরও আমাদের চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত বৃহস্পতিবার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে যে হারে রোগী আসছে তাতে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে আমাদের সব বেড ও আইসিইউ পূর্ণ হয়ে যাবে। তখন পরিস্থিতি সংকটের দিকে যেতে পারে।

তার আশঙ্কা অনুযায়ী আজ শনিবার হাসপাতালটির চিত্র তেমনই দেখা গেছে।

ওইদিন তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঢাকার বাইরে থেকে যেসব রোগী আছে তাদের ৫০ শতাংশকে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হচ্ছে। বাকিদের এইচডিইউ বেডে রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০-৮০ জনের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে। আর ছাড়পত্র পাচ্ছে ৩০-৩৫ জনের মতো। আসন ভরে গেলে তখন আগত রোগীরা ওয়েটিং এ থাকবেন। বেড ফাঁকা হলে সিরিয়াল অনুযায়ী অবস্থার বিবেচনায় তাদের বেডে তোলা হবে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
‘শুধু আইসিইউ বাড়িয়ে হাম পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব না’
হামে মারা যাচ্ছে শিশু, আইসিইউ না পেলে কী করবেন
হামে ২৪ শিশুর মৃত্যু, বিভাগীয় হাসপাতালে নেই আইসিইউ
সর্বশেষ খবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম