বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন স্বেচ্ছায় শীতলক্ষ্যা নদীর সুলতানা কামাল ব্রিজ হতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে মনে করছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাব জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টসহ অন্যান্য সকল সংশ্লিষ্ট আলামত বিবেচনায় নিয়ে র্যাবের তদন্তে এমনটাই বের হয়ে আসে। তবে এখনও তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ৮টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
র্যাব জানায়, গত ৫ নভেম্বর কাজী নূর উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি তার সন্তান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ-এর নিখোঁজ সংক্রান্তে রাজধানীর রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি সূত্রে জানা যায়, তার সন্তান গত ৪ নভেম্বর বিকাল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও র্যাব নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করে।
পরে গত ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একটি মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় নৌপুলিশ। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, মৃতদেহটি ফারদিন নূর পরশের (২৪)। মৃতদেহটি উদ্ধারের পর ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন রাজধানীর রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমগুলোতে বহুলভাবে প্রচারিত হওয়ায় দেশব্যাপী ব্যাপক চ্যাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব ওই মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন পূর্বক জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ফারদিন নূর পরশ নিহত হওয়ার ঘটনায় র্যাব তার পারিবারিক সূত্র, অধিকতর তথ্য প্রযুক্তির বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজসহ স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের আলোকে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের এই কর্মকর্তা সবশেষ তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়, রাত ২ টা ১ মিনিটটে (সিসিটিভি ফুটেজ টাইম ২টা ৩ মিনিট। যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা হতে নিহত ফারদিনকে লেগুনায় উঠতে দেখা যায়। রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিট সুলতানা কামাল ব্রিজের অপর পাশে তারাবো বিশ্বরোডের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লেগুনা থেকে নেমে যায় ফারদিন। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জানা যায় যে, রাত ২টা মিনিট সুলতানা কামাল ব্রিজের তারাবো প্রান্তে ফারদিনের অবস্থান ছিল। ঠিক রাত ২টা ৩৪ মিনিট সুলতানা কামাল ব্রিজের প্রায় মাঝখানে আসে ফারদিন।
উল্লেখ্য যে, ব্রিজের তারাবো প্রান্ত হতে সুলতানা কামাল ব্রিজের মাঝখান পর্যন্ত দুরত্ব আনুমানিক ৪০০-৫০০ মিটার। রাত ২টা ৩৪ মিনিট ৯ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের রেলিং ক্রস করে ফারদিন এবং রাত ২টা ৩৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের উপর থেকে স্বেচ্ছায় নদীতে ঝাঁপ দেয়। ঝাঁপ দেয়ার পর রাত ২ টা ৩৪ মিনিট ২১ সেকেন্ডে শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে পড়ে ফারদিন। রাত ২টা ৩৫ মিনিটে ৯ সেকেন্ড ফারদিনের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও রাত ২টা মিনিটে ঘটিকায় ফারদিনের হাতের ঘড়িতে পানি ঢুকে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টসহ অন্যান্য সব সংশ্লিষ্ট আলামত বিবেচনায় নিয়ে আমাদের তদন্তে বের হয়ে আসে যে, বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন স্বেচ্ছায় সুলতানা কামাল ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ফারদিন হত্যার মামলা তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফারদিনের মৃত্যু সংক্রান্ত অন্য কোনো সূত্র বা আলামত পাওয়া গেলে, তবে তা বিবেচনায় নিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলেও জানান তিনি।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ নভেম্বর বিকাল ৩টায় রাজধানী ডেমরার কোনাপাড়া নিজ বাসা থেকে পরীক্ষার কথা বলে বুয়েটের হলের উদ্দেশ্যে বের হন ফারদিন। বিকাল আনুমানিক ৫টায়। ফারদিন সায়েন্স ল্যাব মোড়ে তার পরিচিত এক বান্ধবীর সঙ্গে তিনি দেখা করেন। তারপর সেখান থেকে নীলক্ষেত ও ধানমন্ডিসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেন। পরবর্তী সময়ে সাত মসজিদ রোডে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পরে রাত আনুমানিক ৮টায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ পাশ্বর্বতী বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে। পরে তিনি রিকশাযোগে রামপুরার উদ্দেশ্যে গমন করে। আনুমানিক রাত পৌনে ১০টায় তার বান্ধবী রামপুরা ব্রিজ এলাকায় রিকশা থেকে নেমে যান এবং ফারদিন কিছুক্ষণ রামপুরা ব্রিজ এলাকায় ঘোরাফেরা করেন।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে করে র্যাব বলছে, এরপরে ফারদিন কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, বাবুবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, পুরান ঢাকার জনসন রোড, গুলিস্তানের পাতাল মার্কেট এলাকাতেও গিয়েছিলেন।









