গুলশানের বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের রেশের মধ্যেই দেশবাসী স্মরণ করছে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ভয়াবহ স্মৃতি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদ এলাকা, প্রাণ হারান ৭১ জন, আহত হন শতাধিক মানুষ। ঘটনার চারবছর পেরিয়ে গেলেও তার রেশ কাটেনি ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। সেই রাতের কথা মনে করলে এখনও আঁতকে ওঠেন তারা। এতকিছুর পরও এলাকাবাসীর মধ্যে আসেনি অগ্নিনির্বাপণ নিয়ে সচেতনতা। খোদ ঘটনার সূত্রপাত হওয়া ওয়াহিদ ম্যানশনেই এখন দোকানে দোকানে ঝুলছে মেয়াদোত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র।
সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ওয়াহিদ ম্যানশনে গিয়ে দেখা যায়, মেরামত করে আবারও চালু করা হয়েছে ভবনটি। ৪ তলা ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক, চতুর্থ তলায় ফ্যামিলি বাসা, এছাড়াও ফাকা পড়ে আছে তৃতীয় তলাটি।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর এই ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মালিক বিভিন্ন জায়গায় তদবির করে ভবনটি মেরামত করে পুনরায় বাণিজ্যিকভাবে চালু করেছেন। ওয়াহিদ ম্যানশনের সামনের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিও মেরামত করে চালু করা হয়েছে।
ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় রয়েছে টেলিকম, খাবার, মুদি ও প্লাস্টিক দানার দোকান। যারমধ্যে মুদি দোকানে নেই কোনও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। মুদি ও প্লাস্টিকের দানার দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। টেলিকমের দোকানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটির মেয়াদ আর কয়েক সপ্তাহ আছে।
প্লাস্টিক দানার দোকানের মালিক আব্দুল কাদের জানান, ঘটনার দিন অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। একই ঘটনায় মৃত্যু হয় তার এক ভাতিজার। ঘটনার সময় দোকান ছেড়ে তিনি বের হতেই, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে বিস্ফোরণ। অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। পরে আবার গতবছর একই জায়গায় দোকান বসিয়েছেন তিনি।
তার দোকানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে একমাস আগে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমার খেয়াল আছে বিষয়টি। ফোন দিবো ওদের চেঞ্জ করে দেওয়ার জন্য। এটাতো রাখতেই হবে, জীবনতো আগে, ১৫০০ টাকা দিয়ে লাগিয়েছি, চেঞ্জ করতে ৩০০ টাকা লাগবে, ওদের চেঞ্জ করে দিতে বলবো শিগগিরই।
পাশের ফাস্ট ফুডের দোকানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত নভেম্বরে। দোকানের মালিক শরীফের কাছে জানতে চাওয়া হলে বলেন, 'আমি ঘটনার পর দোকানটা নিয়েছি, এটাতো মর্মান্তিক একটা বিষয়। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের বিষয়ে অবশ্যই সচেতন থাকা উচিত। কিন্তু সময় সুযোগ মেলাতে পারছি না, এটা চেঞ্জ করতেও নবাবপুর যাওয়া লাগবে। দ্রুতই এটা চেঞ্জ করবো।'
ওয়াহিদ ম্যানশনের সামনের ভবনটিও ঘতিগ্রস্ত হয় ওই রাতে। মেরামত করে ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান ও উপরের তলাগুলোয় বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনের দোকানসহ আশেপাশের দোকানগুলো ও ভবনগুলোতেও চোখে পড়েনি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র।
পার্শ্ববর্তী একটি ওষুধের দোকানের সত্ত্বাধিকারী কামরুল হাসান জানান, তিনি ঘটনার সময় দোকানেই ছিলেন। ভাবছিলেন উঠে মসজিদের সামনে থেকে পান নিবেন। এসময় টাকা নেওয়ার জন্য দোকানের ক্যাশে হাত দিতেই বিস্ফারণ ঘটে।
তার দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকার কারণ জানতে চাওয়া হলে বলেন, 'আল্লাহর জিনিস আল্লাহ বাঁচাবে। বিপদ তো হলে হবেই, আমি কি ঠেকাতে পারবো? শুধু আমার দোকানতো না আশেপাশের কোনও দোকানে যন্ত্র পাবেন না।'
এ বিষয়ে কথা বলতে এলাকার কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন কাবুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'যেটা ঘটার সেটাতো ঘটেই যায়। আমাদের সচেতনতাটা জরুরি, যেন আর কোনও মায়ের বুক খালি না হয়, কোনও স্ত্রী স্বামীহারা না হয়, কেউ স্বজনহারা না হয়। আমি বিষয়টি দেখবো, ওয়াহিদ ম্যানশনে গিয়েও খোঁজ নিবো। এলাকাবাসীর সতর্কতা বাড়াতে জোড় দিবো।'
এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা দফতরের সহকারী পরিচালক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, 'নগরবাসীর নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব প্রথমে নিজের পরে প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, এরপর ফায়ার সার্ভিস। আমরা প্রতি শনিবার মহল্লায় মহল্লায় সচেতনতা কর্মসূচি পালন করি। একটা ঘটনা ঘটে গেলেতো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে, ভবন নির্মাণে সর্তক হতে হবে, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে।
যা ঘটেছিলো চুড়িহাট্টায়
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার নাগাদা পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে। মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হয় পুরো এলাকা। আগুনের সূত্রপাত হওয়া হাজী ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলা থেকে বুলেটের মতো ছুটে বের হতে থাকে আমদানিকৃত বিদেশি সব সুগন্ধির (বডি স্প্রে) ধাতব বোতল। মোড়ের তিনটি সড়কের অনেকদূর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, ভ্যান পিকআপভ্যান, প্রাইভেটকার সবই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা ওই আগুন জ্বলতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত। এঘটনায় মারা যান পথচারীসহ ৭১ জন, আহত হন অন্তত শতাধিক।
ঘটনার তদন্ত শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ মোট ৫টি সংস্থার তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে সব প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত হাজী ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় স্প্রে (কেমিক্যাল) গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।









