দুশ্চিন্তার কারণ গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে উৎপন্ন মিথেন গ্যাস

রিয়াদ তালুকদার
০৭ মার্চ ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৮

২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটে।এতে ৩৪ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এই দুর্ঘটনায় গঠিত কমিটিগুলো বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে–লিক হওয়া মিথেন গ্যাস, আবদ্ধ (এয়ার টাইট) কামরা এবং বৈদ্যুতিক লাইনের চেঞ্জ ওভার (ভল্টেজ আপ-ডাউন)। ২০২১ সালে রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণেও ‘জমে থাকা’ গ্যাসের প্রসঙ্গ আসে। রবিবার (৪ মার্চ) রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকার শিরিন ম্যানশনে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, এখানেও জমে থাকা গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে।

বিভিন্ন সময় সুয়ারেজ লাইনে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। ঘটনাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত মিথেন গ্যাসের কারণে ঘটে বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। অহরহ না ঘটলেও এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানিসহ অনেক মানুষ আহত হন। আর বড় বিস্ফোরণ ঘটলে পুরো ভবনকে ফেলা হয় ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায়।

যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডভান্স ইকোটেক ইউকে লিমিটেড’এর পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরামর্শক ড. নাসির খান জানান, কোনও জায়গায় স্তূপ করে গৃহস্থালি বর্জ্য ফেললে তা থেকে ৭ থেকে ১০ দিন পর নানা ধরনের গ্যাস নির্গত হয়। যাকে বলা হয় ল্যান্ডফিল্ড গ্যাস। এর মধ্যে ৯০ থেকে ৯৮ ভাগই হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেন। প্রাকৃতিক গ্যাসেও ৮৫ থেকে ৯৫ ভাগ পর্যন্ত মিথেন থাকে। মিথেন হচ্ছে বর্ণ ও গন্ধহীন মারাত্মক দাহ্য গ্যাস যা অক্সিজেনের চাইতে হালকা। বদ্ধ স্থানে এই গ্যাস অক্সিজেনকে হটিয়ে স্থান দখল করে নেয়। এছাড়াও নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, সালফাইড, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি গ্যাসও বর্জ্যস্থল থেকে বের হয়। যেগুলো কোনও জায়গায় ৩০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত আটকে থাকতে পারে।

এর মধ্যে মিথেনকে বিবেচনা করা হচ্ছে বিপজ্জনক গ্যাস হিসেবে। বর্জ্য ফেলার স্থান বা আবর্জনার ভাগাড় ভরাট করে দালানকোঠা বা স্থাপনা নির্মাণ করলে মেঝেতে বা অন্য যেকোনও ফাঁক-ফোকর দিয়ে মিথেন গ্যাস ঘরের ভেতর জমা হতে থাকে। যা বাতাসে ভেসে বিভিন্ন বদ্ধ জায়গায়, বিশেষ করে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রুমের উপরিভাগে জানালার ওপরের দিকে জমা হয়।

সম্প্রতি রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় তিনতলা ভবনে বিস্ফোরণে ধসে পড়ে দেয়াল

ড. নাসির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও ভবনে এ ধরনের মাত্রাতিরিক্ত মিথেন গ্যাস জমে থাকলে সেগুলো মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হতে পারে। আর এই গ্যাস যে শুধু বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের জন্য বিপজ্জনক তা নয়, বর্জ্যস্থলের আশপাশে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত এই গ্যাস মানবদেহের বিভিন্ন মারাত্মক রোগবৃদ্ধিতেও ভূমিকা পালন করে।’ একারণেই চুলা ধরানোসহ যে কোনও প্রয়োজনে আগুন জ্বালাতে আগে ঘরের দরজা-জানালা খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেয় ফায়ার সার্ভিস অধিদফতর।

নাসির খান বলেন, রাজধানী ঢাকায় এখন দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ লোক বস্তি কিংবা কাঁচা ঘরবাড়িতে বসবাস করে। এই দুই কোটি মানুষ প্রতিদিন আনুমানিক আধা কেজি হিসেবে এক কোটি কেজি তথা ১০ হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন করে। যার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দৈনিক চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে ফেলে। বাকি বর্জ্য বিক্ষিপ্তভাবে শহরের বিভিন্ন জায়গায় এদিক-সেদিক ফেলা হয়। অন্যদিকে ভরাটকৃত জমিতে বা অনেক সময় সরাসরি গৃহস্থালি বর্জ্য জমানোর স্থলে এসব বর্জ্যের সমন্বয়ে ঢাকা শহরে বস্তি ও আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাসা বাড়িতে লাইনের গ্যাস কিংবা এলপিজি গ্যাসের লিকেজের সাথে আবদ্ধ রুমে জমে থাকা চার মাত্রার বেশি মিথেন গ্যাসের সাথে আগুনের সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সুয়ারেজ লাইনের ত্রুটির কারণেও মিথেন গ্যাস নির্গত হয়।’

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের পরের চিত্র (ফাইল ছবি)

ঢাকা শহরে বস্তিতে আগুন লাগা এখন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন পরপরই কোনও না কোনও বস্তিতে আগুন লেগে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকার চলন্তিকা বস্তি, ২০২০ সালের ৫ মার্চ মিরপুর রূপনগর বস্তি, ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল উত্তরা বালুর মাঠ বস্তি, ২০২২ সালে কল্যাণপুর বস্তি ও ২০২৩ সালে মহাখালীর করাইল বস্তিতে আগুনের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন বহুতল ভবনেও আগুন লাগার খবরও পাওয়া যায় প্রতিনিয়ত।

এসব অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হিসেবে বরাবরই চুলা, শর্ট সার্কিট বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিতযন্ত্রকে দায়ী করা হয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা বিষয় খুব স্পষ্ট, এসব অগ্নিকাণ্ড সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিমিষেই সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয় ঠিকই, কিন্তু দ্রুত তার সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার জন্য অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে; সে বিষয়টি কখনও ভেবে দেখা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে দালানকোঠা নির্মাণের সময় ছাদের নিচে এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত ভেন্টিলেশন থাকতো যা দ্বারা ঘরের ভেতরের জমে থাকা বায়ু চলাচলের একটা ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখনকার দালান কোঠাগুলোতে জানালার ওপরে কোনও ভেন্টিলেশন থাকে না। এর ফলে ওখানে মিথেন গ্যাস জমা হয়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যেসব দালানে আগুন লেগেছে বা বিস্ফোরণ হয়েছে সেখানেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ওইসব দালানে জানালার ওপর ছাদের নিচে কোনও ভেন্টিলেশন ছিল না। ওখানেও মিথেন গ্যাস জমে ছিল। এসব ক্ষেত্রেও জানালার ওপরে ফ্যান বা এসির মতো যন্ত্রগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মগবাজারে ভবনে বিস্ফোরণ (ফাইল ছবি)

২০২১ সালের ৮ এপ্রিল সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর খবরে বলা হয়েছে, প্যারিসভিত্তিক কোম্পানি কেরোস সাস-এর স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের ওপরে মিথেন গ্যাস নির্গমন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দেখা গেছে।

ড. নাসির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মিথেন নির্গত হয় গৃহস্থালি বর্জ্যেও, এটি একটি প্রধান কারণ। আমাদের এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। ১৮ কোটি মানুষের ছোট্ট এই দেশে দৈনিক ৯ কোটি কেজি তথা ৯০ হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য বিক্ষিপ্ত ফেলে রাখা হয়। যা থেকে দৈনিক হাজার হাজার টন মিথেন ও অন্যান্য বিপজ্জনক গ্যাস তৈরি হচ্ছে। যা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা নিয়ে যথাযথ পদ্ধতিতে দেশের গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঘরের ভেতর মাত্রাতিরিক্ত মিথেন গ্যাস জমে থাকলে তা দাহ্য বস্তু হিসেবে পরিণত হয়। পরবর্তীতে আগুনের সংস্পর্শে এলেই তা ব্যাপকতা তৈরি করে। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিতযন্ত্রগুলো (এসি) বিভিন্ন ভবনে পাশাপাশিভাবে লাগানোর কারণে কোথাও কোনও এয়ারকন্ডিশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের পাশাপাশি ব্যাপক বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয় ঘটে প্রাণহানির মতো ঘটনা। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বদ্ধ অবস্থায় মিথেন গ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য গ্যাস বিক্রিয়া করে কিংবা আগুনের সংস্পর্শ পেলেই বিস্ফোরণ ঘটে। বাসায় কোনও লিকেজ রয়েছে কিনা, রুম বদ্ধ অবস্থায় রয়েছে কিনা, শর্ট সার্কিটের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, নিয়মিত বিদ্যুতের লাইন চেক করা; এসব বিষয় সম্পর্কে নগরবাসীকে আরও সচেতন থাকতে হবে।

/ইউএস/এফএস/
সম্পর্কিত
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
কদমতলীতে ইন্টারনেট সার্ভিসের ৩ কর্মীকে মারধর
মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির পূর্বাভাস ঢাকায়, কমতে পারে গরম
সর্বশেষ খবর
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে:  প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: যা আছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে
আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: যা আছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের