সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করাকে আরও দুই বছর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের পরিবর্তে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
বুধবার (২৬ এপ্রিল) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এদিকে সংসদীয় কমিটি ব্লক ইটের ব্যবহারকে থ্রাস্ট সেক্টর ঘোষণা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পোড়ানো ইটের বদলে ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রণোদনাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার সুপারিশ করেছে।
বৈঠকে জানানো হয়, সারা দেশে বর্তমানে ৮ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। এই ভাটাগুলোতে ৩৫০০ কোটি ইট পোড়ানো হয়। এসব ইট পোড়াতে ৫৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহার করা হয়। এতে বায়ু দূষণ, কার্বন নিঃসরণের পাশাপশি ১২ কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টন টপ সয়েল নষ্ট হচ্ছে।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যের কথা উল্লেখ কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পোড়ানো ইটের কারণে সার্বিকভাবে আমাদের ডিজিপির ক্ষতি হচ্ছে ৭.৭ থেকে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের সমৃদ্ধির রেটের পুরোটাই ইটভাটার কারণে চলে যাচ্ছে। এছাড়া প্রতি বছর আমাদের ৯০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটছে, তার ১৫ শতাংশ ঘটছে ইটভাটা জনিত নিঃসরণে।
সভাপতি জানান, সরকারি নির্মাণ কাজে ব্লক ইট ব্যবহারের জন্য আগেই প্রজ্ঞাপন ছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। বছরে উৎপাদিত ৩৫০০ কোটি ইটের ৯২ শতাংশ সনাতন পদ্ধতিতে হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পোড়ানো হয় ৭ শতাংশ। বাকি এক শতাংশ না পোড়ানো ইট (ব্লক ইট) ব্যবহার হচ্ছে।
বুধবার কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন উল্লেখ করে সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ৫টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসেছিলাম। আগামী বছর তাদের কী পরিমাণ ইটের চাহিদা, তা দুই সপ্তাহের মধ্যে জানাতে বলেছি। তাদের চাহিদার তথ্য নিয়ে আমরা ব্লক ইট উৎপাদনকারীদের সঙ্গে বসবো। দুটোর সমন্বয় করে আমরা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে চাই। আমাদের টার্গেট আগামী বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ব্লক ইট ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। এ বিষয়ে আমরা উৎপাদনকারীদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেছি। যারা সনাতন পদ্ধাতির ইটভাটার মালিক, তাদের প্রণোদনা দিয়ে ব্লট ইটে কিভাবে আনতে পারি, সেটার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরে দেশের ৪৯৫টি উপজেলার প্রতিটিতে অন্তত ৪ কিলোমিটার রাস্তা ব্লক ইট দিয়ে তৈরি করবে বলে কমিটিতে আশ্বাস দিয়েছে।
সাবের হোসেন জানান, ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি নির্মাণ কাজে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা রিভাইস করে ২০২৭ সাল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
প্রসঙ্গত, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর ব্লক ইট ব্যবহারের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, সরকারি নির্মাণকাজে ধাপে ধাপে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানো হবে। এ জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি নির্মাণকাজের ১০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহার করতে হবে।
এদিকে বৈঠকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও বনবিভাগের মাটির চুরির ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কমিটি। এক্ষেত্রে বালু ও মাটির বাজার মূল্যের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণের সঙ্গে আরও অন্তত ২৫ শতাংশ জরিমানার সুপারিশ করেছে কমিটি।
এছাড়া বৈঠকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পরিবেশ-পরিচিতির কারিকুলামগুলো আরও আধুনিক ও বাস্তবসম্মত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টিতে বিজ্ঞানের মতো প্রাকটিক্যাল পাঠ বা ডেমোনেস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হ— বৈঠকে বন বিভাগের ভূমি বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনকে লিজ প্রদানের কারণ উদঘাটন এবং রাবার চাষের জন্য লিজকৃত ভূমিগুলো রাবার চাষের কাজে ব্যবহ্নত হচ্ছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই করে মতামত প্রদানের জন্য কমিটি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে।
সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-মন্ত্রী হাবিবুন নাহার এবং খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন অংশগ্রহণ করেন।









