মেয়ে হয়ে জন্মেছো এত পড়ালেখা করে কী হবে, একের পর এক মেয়ে জন্ম দাও তোমাকে শেষ বয়সে কে দেখবে? তোমার তো কোনও ছেলে সন্তান নেই, বংশের বাতি জ্বালাবে কে?– সমাজে প্রচলিত এই সব বাক্যবাণে জর্জরিত হন না এমন মেয়ে, এমন মায়ের সংখ্যা কম নয়। এই বাক্যগুলো মেয়ে সন্তানদের এগিয়ে যেতে শুরুতেই বাধা দেয়। বাবা মাও খুব একটা সাহস করেন না এইসব বাক্যকে এড়িয়ে মেয়েকে তার নিজ পথ তৈরির সুযোগ করে দিতে। কিন্তু শারমিন আখতার ব্যতিক্রম। তিন বোনের মধ্যে বড় শারমিন সম্প্রতি জার্মানিতে রাইন ওয়াল ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্স থেকে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমন্টের ওপর মাস্টার্স শেষ করেছেন। পড়া শেষের আগেই তিনি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে প্রথম সারির চাকরি পেয়েছেন। জয়পুরহাটের হাটুভাঙা গ্রামের তিনিই একমাত্র মেয়ে যিনি বিদেশের ডিগ্রি নিয়ে নিপ্পন পেইন্ট অটোমটিভ কোটিং-এ সম্মানের চাকরির অফার পেয়েছেন। সেই শারমিনের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তিনি শোনান প্রথা ভাঙার গল্প।
৬ মে শারমিন তার ফেসবুক ওয়ালে কনভোকেশনের ছবি আপলোড করেন। তিনি লেখেন, “ভয়াবহ male dominated, stereotypical, sexist and uneducated গ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার গল্পটা অনেকের থেকে ভীষণ আলাদা আমার! স্কুল শেষ হওয়ার আগে বড় মামা আম্মাকে বললেন, ‘তোর খালি বেটি (মেয়ে), মোর কাছেই বাড়ির জায়গা কিনে থাক’! আম্মা মামার কাছেই বাড়ি করেছে কিন্তু ঠিক কতখানি সহায়তা পেয়েছে সেটা ভিন্ন আলাপ!”
কোনও ভাই নেই, তিন বোন হওয়ায় আত্মীয় সমাজ কেউই বাদ যায়নি কটাক্ষ করা থেকে। শারমিন বলেন, “কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছোট খালু আমাকে বললেন, ‘ওত বড় স্বপ্ন দেখে লাভ নাই, শিরট্রি কলেজে মহিলা লেকচারার নেবে যোগাযোগ করো’! বিশ্ববিদ্যালয় শেষ অধ্যায়ে, সকল কাজিন আপুদের কথা ‘বিসিএস দাও তুমি, তোমার হয়ে যাবে’! ছোট মামি আমি বিদেশে আসার আগ অব্দি আম্মাকে বলেছেন, ‘তোর বংশের বাতি দেওয়ার কেউ নাই’! বাবাকে চাচাসহ পরিচিতদের টিপ্পনী, বেটিছলক (মেয়ে) এত পড়ায়ে কি হবে!”
এসবের মধ্য দিয়ে দেশে লেখাপড়া শেষ করে জার্মানি যান শারমিন। কীভাবে সম্ভব হলো জানতে চাইলে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরে নৃবিজ্ঞান বিভাগে পড়তে শুরু করাটা আমার চিন্তার জগৎ বদলে দিতে থাকে। আমি সেকেন্ড ইয়ার থেকেই চিন্তা করতে থাকি কীভাবে বিদেশে অ্যাডমিশন নেওয়া যায়। যেহেতু জার্মানিতে টিউশন ফি লাগে না আমি সেই চেষ্টা করতে থাকি। আর পড়া শেষে চাকরিতে যুক্ত হয়ে যখন কিছু টাকা হাতে আসে তখন ল্যাঙ্গুয়েজ পরীক্ষা দেওয়া, ভিসা করার মতো বিষয়গুলো সহজ হয়। এরপর শুরু হয় আসল লড়াই। বাবাকে রাজি করাতে তিন বছর লেগেছে। অবশেষে ২০১৭ সালে যখন বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়ে যাই তখন বাবা রাজি হন।’
শারমিনের এই খুশির সময়ে সেই বাবা পাশে নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে মারা গেছেন। শারমিন বলেন, ‘আমি গত পাঁচ বছর ধরে পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করি। আমার দ্বিতীয় বোন উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে চেষ্টা করছেন। ছোটজন এইচএসসি পড়ছেন।’ তাকেও বিদেশে পড়ার সুযোগ করে দিতে চান শারমিন। এই খুশির সময়ে মায়ের অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার মা খুশি, গর্বিত। একই সঙ্গে এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জীবনে আমি পিছিয়ে পড়ছি কিনা সেটা নিয়েও চিন্তিত।’
এই যে সমাজের এত এত নিগ্রহ, তিন বোনের এগিয়ে চলার মধ্য দিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির কিছুই কি পরিবর্তন হয়নি? –জানতে চাইলে শারমিন বললেন, ‘হয়েছে। আগে যারা কেবল আমরা মেয়ে বলে মাকে নানাভাবে অপমান করেছে তারা এখন আর সেসব আলাপ তোলে না। যারা ভেবেছে মেয়ে মানুষ বিয়ে করে নিজের সংসারে চলে যাবে, তার জন্য বাবা-মায়ের খুব বেশি কিছু করা উচিত না, তারা যখন দেখেছে আমি পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছি, কথা থামিয়ে দিয়েছে। এই যে প্রথা ভাঙার গল্প, এটি ঘরে ঘরে তৈরি হোক। আমি আনন্দ নিয়ে দেখবো।’









