তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নিজেদের ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দুর্বৃত্তরা পুলিশের ওপর বিনা কারণে হামলা করে অস্ত্র-গুলি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এগুলো উদ্ধারের জন্য নানা কৌশলে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা অস্ত্র-গুলি ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরাও নষ্ট করেছে। এ কারণে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
এদিকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের অস্ত্র-গুলি ও যানবাহনের দিকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার। একই সঙ্গে বেতারযন্ত্র ব্যবহারেও সতর্কতা অবলম্বনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায়ও পুলিশের ওপর হামলা করে অস্ত্র-গুলি লুট করা হতে পারে আশঙ্কা করে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। এসময় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। গুরুতর আহত এক পুলিশ সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠানো হয়েছে।
ওই দিন পুলিশের ওপর হামলার পাশাপাশি পল্টন ও শাজাহানপুর এলাকা থেকে দুটি পিস্তল, দুটি শটগান, একটি রাইফেল, একটি গ্যাসগানসহ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় পল্টন ও শাজাহানপুর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে।
তবে দায়িত্বশীল একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পরবর্তী সময়ে অবশ্য কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র থানায় জমা হয়েছে। আহত পুলিশ সদস্যদের আগ্নেয়াস্ত্র অপর সদস্যরা থানায় জমা দিলে পরে তা সমন্বয় করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত একটি পিস্তল মিসিং রয়েছে। সরকারি ওই পিস্তলটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
পল্টন থানার মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. ইউসুফ জানান, তার কাছে তদন্ত থাকা অবস্থায় অস্ত্র-গুলির কোনোটি উদ্ধার করতে পারেননি। পরবর্তীতে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স থেকে মামলাটি তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আলোচিত ওই ঘটনায় পুলিশের ছিনতাই হওয়া অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের জন্য জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এত লোকজনের সমাগম হয়েছিল যে সুনির্দিষ্ট করে কারা এসব করেছে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও তথ্য-প্রযুক্তি ও প্রথাগত সোর্স ব্যবহার করে সরকারি অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আর্মস উদ্ধারের জন্য আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি। ঘটনার সময়কার সব সিসিটিভি ফুটেজ আমরা চেক করছি। কিন্তু ঘটনার সময় দুর্বৃত্তরা কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছে। মনে হয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবেই এই কাজ করেছে। এজন্য আর্মস ছিনিয়ে নেওয়া দুর্বৃত্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে একটু সময় লাগছে।’
এদিকে ডিএমপি সদর দফতর সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনার প্রত্যেক পুলিশ সদস্যদের নিজ নিজ নামে বরাদ্দকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও পুলিশের ওপর হামলার আশঙ্কা করে পুলিশ সদস্যদের যথাযথ নিরাপত্তা গিয়ার পরে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফোর্সকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শকও এক নির্দেশনায় পুলিশ সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের ডিউটির সময় একজন ক্যামেরাম্যান সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে পুলিশের ওপর যেকোনও আক্রমণের ঘটনার ইলেক্ট্রনিক এভিডেন্স সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া ডিউটির সময় সরকারি গাড়ি নিরাপদ স্থানে রাখার পাশাপাশি কোনও অবস্থাতেই চালকরা যাতে গাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও অবস্থান না করেন সেই নির্দেশনা দিয়েছেন।
ডিএমপি সূত্র জানায়, সম্প্রতি ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় পুলিশ সদস্যদের বেতারযন্ত্র (ওয়াকিটকি) ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে বেতারযন্ত্রে কথোপকথনের সময় পুলিশ ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি সাধ্যমতো এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বেতারবার্তা আদান-প্রদান করার সময় কেউ যাতে রেকর্ড করতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশ সদর দফতর থেকে পল্টন ও সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় মন্দির ও গির্জায় কোনও হামলা হয়েছে কিনা, বেতারযন্ত্রের এরকম একটি কথোপকথনের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।









