দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান মাস। আসন্ন এই পবিত্র মাসকে কেন্দ্র করে চলছে মানুষের কেনাকাটার প্রস্তুতি। রোজা শুরুর আগে আজকে ছিল শেষ শুক্রবার, এই ছুটির দিনকে কেন্দ্র করে বাজারে মানুষের উপস্থিতি ছিল অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আর মানুষের এই উপস্থিতির সুযোগেই গত দুইদিনের ব্যবধানে বাজারে সবজির দাম বেড়ে গেছে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ। একইসাথে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মাছ-মাংসের দামও। তবে সবজি ও মাছ-মাংসের দাম বাড়লেও বাড়েনি আলু-পেঁয়াজ বা মুদি দোকানের পণ্যের দাম।
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় বাজারের এই চিত্র।
দুইদিন আগে (২৬ ফেব্রুয়ারি) এই একই বাজারে রোজা উপলক্ষে চাহিদা থাকা লম্বা বেগুন বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজিতে। কিন্তু আজকে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে। শসা বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে, অথচ আজকে এই শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা করে। লেবুর হালিও দুদিন আগে বিক্রি হয়েছে ৬০ করে, কিন্তু আজকে মানভেদে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। তবে কেবল এসব সবজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই মূল্যবৃদ্ধি, কয়েকটি বাদে প্রায় সব সবজির দামই দুইদিনের ব্যবধানে নতুন করে বেড়েছে।
আজকের বাজারে প্রতি কেজি টক টমেটো ৩০-৪০ টাকা, দেশি গাজর ৪০ টাকা, শিম ৫০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০-১২০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ৭০-৮০ টাকা, কালো গোল বেগুন ৭০-৮০ টাকা, শসা ৮০-১০০ টাকা, উচ্ছে ৮০- ১০০ টাকা, করল্লা ১০০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, মূলা ৪০ টাকা, শালগম ৩০ টাকা, ঢেঁড়স ১২০ টাকা, পটল ১৪০-১৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, পেঁয়াজকলি ৪০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা, ধনেপাতা ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৮০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০ টাকা, ফুলকপি ৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি কাঁচা কলা ৩০ টাকা, হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা করে।
এক্ষেত্রে দেখা যায় গত দুইদিনের ব্যবধানে মানভেদে প্রতি কেজিতে টক টমেটোর দাম বেড়েছে ১০ টাকা, দেশি গাজরের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, শিমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, লম্বা বেগুনের দাম বেড়েছে ২০-৬০ টাকা, সাদা গোল বেগুনের দাম বেড়েছে ১০-২০ টাকা, কালো গোল বেগুনের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, শসার দাম বেড়েছে ৪০ টাকা, উচ্ছের দাম বেড়েছে ২০ টাকা, মূলার দাম বেড়েছে ২০ টাকা, ঢেঁড়সের দাম বেড়েছে ২০ টাকা, পটোলের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, চিচিঙ্গার দাম বেড়েছে ২০ টাকা, ধুন্দলের দাম বেড়েছে ৪০ টাকা, ঝিঙার দাম বেড়েছে ২০ টাকা, বরবটির দাম বেড়েছে ২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার দাম বেড়েছে ১০ টাকা। আর প্রতি পিসে লাউয়ের দাম বেড়েছে ২০ টাকা। এছাড়া হালিতে লেবুর দাম বেড়েছে ১০-২০ টাকা, কাঁচা কলার দাম ৫ টাকা। কেবল ফুলকপির দাম কমেছে প্রতি পিসে ১০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সবজির দাম রয়েছে অপরিবর্তিত।
রোজাকে কেন্দ্র করেই এই মূল্যবৃদ্ধি কিনা জানতে চাইলে বিক্রেতারা তা অস্বীকার করেন। তারা বলেন, সবজির সিজন শেষ হওয়াতেই মূলত এই দাম বৃদ্ধি। এর সাথে রোজার কোন সম্পর্ক নেই।
কিন্তু দুইদিনের মধ্যেই দাম প্রায় দ্বিগুণ হলো কীভাবে এমন প্রশ্ন করলে বিক্রেতারা এর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি।
এসময় বাজার করতে আসা সাজ্জাদ হোসেন রনি বলেন, রোজায় নাকি দাম বাড়বে না, কই এমন তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। লেবুর হালি ৮০ টাকা বেগুনের কেজিও ১০০ টাকার মতো। তাহলে তো আগের মতোই হলো। চেঞ্জটা কই হলো? ব্যবসায়ী শুধু বলে সবজির সিজন শেষ। এক কথা দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে।
অপরিবর্তিত আলু-পেঁয়াজের দাম
সবজির দাম বাড়লেও আজকে আলু-পেঁয়াজ-আদা-রসুনের দাম বাড়েনি, রয়েছে অপরিবর্তিত। তবে নতুন ভারতীয় আদার দাম প্রতি কেজিতে কমেছে ২০ টাকা।
আজকে মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি নতুন দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। এরমধ্যে ছোট আকারের পেঁয়াজ ৪০ টাকা এবং বড় আকারের পেঁয়াজ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আজকে প্রতি কেজি নতুন সাদা আলু বিক্রি হচ্ছে ২০-২৫ টাকা, নতুন লাল আলু ২০-২৫ টাকায়। নতুন বগুড়ার আলু ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আজকে নতুন দেশি রসুন ১২০ টাকা, চায়না রসুন ২৪০ টাকা, চায়না আদা ২০০-২২০ টাকা, নতুন ভারতীয় আদা ১২০ দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারেও অস্বস্তি
আজকে বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া আজকে ওজন অনুযায়ী ব্রয়লার মুরগি ২০৩- ২১০ টাকা, কক মুরগি ২৭৩-২৯৫ টাকা, লেয়ার মুরগি ২৯০-২৯৩ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন লাল ডিম ১২০ টাকা, সাদা ডিম ১২০ টাকা।
এক্ষেত্রে দেখা যায় গত দুইদিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ৬ টাকা, কক মুরগির দাম বেড়েছে ৩ টাকা। তবে লেয়ার মুরগির দাম কমেছে ৭-১০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য মাংস ও মুরগির ডিমের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত।
এসময় রাইছা চিকেন হাউজের বিক্রেতা বলেন, ৩ দিনের মধ্যে ১০০ টাকা বেড়েছে দেশি মুরগির দাম। দেশি মুরগির চাহিদা বেশি তো তাই দাম বেড়েছে। তবে দুই তিন রোজার দিকে দাম কমে যাবে।
মায়ের দোয়া চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. আতিক বলেন, এখন রোজার কারণে দাম বেড়েছে, সামনে ঈদের কারণে বাড়বে। দাম বাড়তে কেবল উসিলা লাগে। তবে রোজার মাঝামাঝি সময়ে দাম কমবে কিছুটা।
বাজার করতে আসা ক্রেতা সুমন বলেন, পৃথিবীর সব মুসলিম দেশে রোজার সময় সব জিনিসের দাম কমে যায়। খালি আমাদের এখানেই বাড়ে। দেশি মুরগির দাম ৫০ টাকা বেড়ে গেলো। সেদিন দেশি মুরগি দেখে গিয়েছি লাগতো না হলে নেইনি। ভেবেছি ছুটির দিনে অন্য সদাইয়ের সাথে কিনবো। এখন দেখি ৫০ টাকা দাম বেড়ে গেছে। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা।
এদিকে কেবল মাংসের দামই বাড়েনি। বেড়েছে প্রায় সব ধরনের মাছের দামও। মাছের বিক্রেতারা বলেন, আমরা দুইদিন আগেও আধা কেজি (৫০০গ্রাম) ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি করেছি ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকায়। আজকে সেই মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। আর শুধু ইলিশ মাছ না সব মাছের দামই অনেক বেড়েছে।
কেন দাম বেড়েছে জানতে চাইলে তারা বলেন, হঠাৎ মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এরকম দাম বেড়ে গেছে। তবে এভাবে হুট করে সাধারণত দাম বাড়ে না।
এছাড়া আজকের বাজারে আকার ও ওজন অনুযায়ী ইলিশ মাছ ১৬০০ (৫০০ গ্রাম)-২৮০০ (১ কেজি) টাকা, রুই মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, কাতল মাছ ৪০০-৭০০ টাকা, কালিবাউশ ৬০০-৭০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৮০০-১৬০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৫০০ টাকা, কৈ মাছ ২০০-১০০০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০-১২০০ টাকা, টেংরা মাছ ৮০০- ১২০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৬০০-১২০০ টাকা, শোল মাছ ৭০০-৯০০ টাকা, মেনি মাছ ৬০০ টাকা, চিতল মাছ ৭০০-১০০০ টাকা, সরপুঁটি মাছ ২৫০-৫০০ টাকা, রূপচাঁদা মাছ ৮০০-১৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুদি দোকানের পণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত
অন্যান্য সময় রমজান মাস শুরুর আগেই বেসন, ডাল, ছোলা, চিনির মতো মুদিপণ্যের দাম বাড়তে থাকলেও এবার কিন্তু এখনও তেমন কিছু ঘটেনি। এখনও এসব পণ্যসহ অন্যান্য মুদিপণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। তবে দাম কম এমনটা বলা যাচ্ছে না।
আজকের বাজারে প্রতি কেজি বুটের বেসন ১৪০ টাকা, অ্যাংকর বেসন ৮০-৯০ টাকা, ছোট মসুর ডাল ১৩৫ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১১০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারি ডাল ১১০ টাকা, বুটের ডাল ১২০ টাকা, মাষকলাইয়ের ডাল ১৯০ টাকা, ডাবলি ৬০ টাকা, ছোলা ১২০ টাকা, প্যাকেট পোলাও চাল ১৫০ টাকা, খোলা পোলাও চাল মানভেদে ১১০-১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৫৭ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা, খোলা চিনি ১২০ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৫০ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১১৫ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে রোজা শুরুর এই আগমুহূর্তে এসেও সয়াবিন তেলের সংকট কাটেনি। এখনও এই ভোজ্যতেল নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বাজার করতে আসা এক ক্রেতা অভিযোগ করে বলেন, তেলের দাম বাড়লো ঠিকই, কিন্তু আমরা বেশি দামেও কিনতে পারছি না। অথচ রোজার সময় তেলের চাহিদা থাকে বেশি। আবার তেল পেলেও একই দোকান থেকে অন্য কোনও জিনিস কিনতে হয়।
বিক্রেতাদের অভিযোগ, তাদের কোম্পানি থেকে তেল দিচ্ছে না। তারা বলেন, এই সময়ই তো আমাদের বেশি তেল দেয়ার কথা কোম্পানিগুলোর, যাতে আমরা বিক্রি করতে পারি। অথচ আমরা সেটি পারছি না। কাস্টমার ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।








