সমুদ্র দূষণ প্রতিরোধ ও সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশের জোরালো অঙ্গীকার

নুরুজ্জামান লাবু, নিস (ফ্রান্স) থেকে
১২ জুন ২০২৫, ১৪:৪০আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৫, ১২:৩৪

বাংলাদেশের আওতাধীন সমুদ্র সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আর দূষণ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে জাতিসংঘের সমুদ্র সম্মেলনে। বিশেষ করে সমুদ্রে অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা বন্ধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া হংকং কনভেনশনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জাহাজ রিসাইক্লিং আইন সংশোধন করেছে বাংলাদেশ, যাতে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগেই দেশটি এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। একইসঙ্গে জাতীয় সীমার বাইরের মহাসাগরে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দিকে বাংলাদেশের সচেতন দৃষ্টি রয়েছে। টেকসই ও সহনশীল ভারত মহাসাগর অঞ্চলের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ উইমস্টেক, আইএসএ ইন্ডিয়া, আইওরা’র মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

সোমবার (৯ জুন) তৃতীয়বারের মতো জাতিসংঘ মহাসাগর সম্মেলন-২০২৫ শুরু হয়েছে। ফ্রান্স ও কোস্টারিকার যৌথ আয়োজনে এবারের সমুদ্র সম্মেলন হচ্ছে ফ্রান্সের নিস শহরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানসহ সরকারি প্রতিনিধি, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সংগঠন এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। বরাবরের মতো বাংলাদেশও এবার সমুদ্রসম্পদ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে।

সম্মেলনের একটি সেশনে অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা নিয়ে বাংলাদেশের পরিচয়, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত সুস্থতার সাথে সমুদ্র গভীরভাবে জড়িত। সমুদ্র সংরক্ষণে আমাদের অঙ্গীকারের ভিত্তি হলো জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য সি (ইউএনসিএলওএস), যা আমরা সমুদ্রের সংবিধান হিসেবে মানি। মহাসাগরের জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক পরিবেশের স্বাস্থ্যের ওপর আমাদের কোটি মানুষের জীবিকা ও সুস্থতা নির্ভর করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, এলাকা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং আমরা অন্য দেশগুলোর মধ্যেও এই চুক্তির অনুসমর্থন বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সমুদ্র সম্মদ রক্ষা দূষণ প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমরা আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৮.৮ শতাংশ এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (এমপিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছি এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রতিবেশ চিহ্নিত করে এই সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ দুটি নতুন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন সামুদ্রিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ চিহ্নিত করে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এছাড়া বিবিএনজে চুক্তি অনুসমর্থনের পর, বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো এর বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের প্রস্তুতি বৃদ্ধি করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনত বাধ্যতামূলক চুক্তির ব্যাপক অনুসমর্থনকে উৎসাহিত করা।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের এই সদস্য বলেন, আমরা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ একটি টেকসই, ন্যায়সঙ্গত এবং বৈজ্ঞানিক-ভিত্তিক সমুদ্র ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জন্য সকল অংশীদারের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।

অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ও শিপ ব্রেকিং প্রধান সমস্যা
বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ রক্ষা এবং সমুদ্র দুষণের প্রধাণতম দুটি কারণ হলো অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরা এবং অবৈধভাবে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ সমুদ্রের টেকসই ব্যবহার এবং মেরিন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত এবং অঘোষিত (আইইউইউ) মাছ ধরা রোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ সমুদ্রের সম্পদ রক্ষায় অবৈধ জাল, ট্রলার এবং বিদেশি জাহাজের অনুপ্রবেশ রোধে নজরদারি বাড়িয়েছে। দেশের সমুদ্র অর্থনীতি এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকার জন্য হুমকি তৈরি করা অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি জানান, সমুদ্রের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে আইইউইউ (ই-লিগ্যাল, আনরিপোর্টেড, আনরেগুলেটেড) মাছ ধরা বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ আগামীতে নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবেশ রক্ষা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজ ভাঙা খাতের আইন সংশোধন করেছে। জাতিসংঘ মহাসাগর সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানান, হংকং কনভেনশনের পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং অ্যাক্ট সংশোধন করা হয়েছে, যা কনভেনশন কার্যকর হওয়ার আগেই প্রয়োগে আনতে চায় সরকার।

চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকায় বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ ভাঙা শিল্প রয়েছে। এই শিল্পে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানান, জাহাজ ভাঙা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

/জেএইচ/
সম্পর্কিত
নতুন বিশ্ব মানচিত্রে ভারতকে বড় দেখাচ্ছে কেন?
বিশ্বের নতুন মানচিত্র অনুমোদন দিলো জাতিসংঘ
ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবাধিকারই টেকসই শান্তির সংস্কৃতি গড়ার ভিত্তি: আইরিন খান
সর্বশেষ খবর
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
গাজাবাসীদের স্থানান্তরের ইসরায়েলি প্রস্তাবের নিন্দায় ৮ দেশ
গাজাবাসীদের স্থানান্তরের ইসরায়েলি প্রস্তাবের নিন্দায় ৮ দেশ
আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিল পাস
আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিল পাস
সর্বাধিক পঠিত
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
ডিভোর্স হয়েছে সৃজিত-মিথিলার? ইঙ্গিত দিলেন নির্মাতা নিজেই
ডিভোর্স হয়েছে সৃজিত-মিথিলার? ইঙ্গিত দিলেন নির্মাতা নিজেই
ফোর্বসের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকা থেকে বাদ আজিজ খান
ফোর্বসের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকা থেকে বাদ আজিজ খান
লংমার্চের গাড়িবহরকে লালকার্ড দেখালেন তিনি
লংমার্চের গাড়িবহরকে লালকার্ড দেখালেন তিনি
যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে পর্নোগ্রাফিকে বৈধতার পথে ইউক্রেন
যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে পর্নোগ্রাফিকে বৈধতার পথে ইউক্রেন