পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী হত্যা: কংক্রিটের সেই টুকরোকে ঘিরে কৌতূহল

আরমান ভূঁইয়া
১৪ জুলাই ২০২৫, ১৫:০০আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ১৭:৩২

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ভেতরে এখন আর নেই রক্তের দাগ কিংবা ক্রাইম সিনের ব্যারিকেড। তবে পড়ে আছে সিমেন্টে জমাট বাঁধা ভারী দুটি কংক্রিটের টুকরো; যার একটি বড়, অন্যটি তুলনামূলক ছোট। সেই টুকরো দুটিকেই ঘিরে চারপাশে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী মানুষ স্মরণ করছেন নিহত ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। জটলার মধ্য থেকেই নানান মন্তব্য করছেন তারা। কেউ কেউ কংক্রিটের সেই টুকরোর ছবি তুলছেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও এটিকে ঘিরেই সংবাদ উপস্থাপন করছেন।

গত ৯ জুলাই রাজনৈতিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটে প্রকাশ্যে সোহাগকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মারধরের একপর্যায়ে ইট ও ভারী কংক্রিটের খণ্ড দিয়ে সোহাগের শরীর ও মাথায় আঘাত করে হামলাকারীরা। পরে তার মরদেহ টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে হত্যাকারীরা উল্লাস প্রকাশ করে তারা। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

রবিবার (১৩ জুলাই) বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, অনেক মানুষ সেখানে ভিড় করেছেন। অনেকে জানান, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাই জায়গাটি দেখতে এসেছেন। গেটটি বন্ধ থাকলেও পাশের পকেট গেট খোলা ছিল। যেখানে সোহাগকে হত্যা করা হয়, সেখানে এখনও ভিড় লেগেই আছে।

‘ইটটার চারপাশে যেন ইতিহাস ঘুরছে’

স্থানীয় বৃদ্ধ মিজানুর রহমান বলেন, ‘এই ইট দিয়েই হয়তো ওর মাথায় মারা হয়েছে। মানুষ মানুষকে এতটা নির্মমভাবে মারতে পারে, ভাবতেই কষ্ট হয়।’ পাশেই দাঁড়ানো যুবক ফাহিম গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘সবকিছু এখন এই ইটটার ওপর নির্ভর করছে।’

কংক্রিটের সেই টুকরো ঘিরে জটলা, নানাজন করছেন নানান মন্তব্য (ছবি: প্রতিবেদক)

সেখানে উপস্থিত সবাই জানেন, কদিন আগেই প্রকাশ্য দিবালোকে এখানে হত্যা করা হয়েছে সোহাগকে। প্রথমে দোকান থেকে ধরে এনে মিটফোর্ড হাসপাতালের ভেতরে তাকে নির্দয়ভাবে মারধর করা হয়। এরপর ইট ও রড দিয়ে শরীর থেঁতলে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মরদেহ টেনে এনে গেটের বাইরে ফেলে প্রকাশ্যে উল্লাস করে হত্যাকারীরা। এখন সেই ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা কংক্রিটের টুকরো যেন এই নির্মমতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

হত্যার আলামত এখনও রাস্তায় কেন?

প্রশ্ন উঠেছে—হত্যাকাণ্ডের আলামত হিসেবে ব্যবহৃত কংক্রিটের খণ্ড এখনও কেন সরানো হয়নি? জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলামত আমরা সংগ্রহ করেছি। এই ইট হয়তো বাইরে থেকে এসেছে।’

মামলা ও গ্রেফতার

নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন এজাহারভুক্ত ১৫ নম্বর আসামি তারেক রহমান রবিন, যাকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে পৃথক একটি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

পরিকল্পিত ‘কিলিং মিশন’

তদন্তে উঠে এসেছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। সূত্র জানায়, খুনিরা ‘গণপিটুনির ছায়া’ ব্যবহার করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, সোহাগকে প্রকাশ্যে হত্যা করে ‘মব লিনচিং’ বলে চালিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি হত্যার পর উল্লাস করার বিষয়টিও ছিল পরিকল্পনার অংশ, যাতে ঘটনাটি বিভ্রান্তিমূলক দিক পায় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটে কংক্রিটের ‍টুকরোগুলোকে দেখতে আসছেন অনেকেই

বন্ধুত্ব থেকে শত্রুতা

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মাহমুদুল হাসান মাহিন সোহাগের কাছে চাঁদা দাবি করছিলেন। জুন মাস থেকে তিনি নির্দিষ্ট হারে চাঁদার চাপ দিলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও ‘সোহানা মেটাল’ দোকান দখলের উদ্দেশ্যে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় মাহিন-টিটন গাজী গ্রুপ।

প্রথমে দোকানেই হত্যার পরিকল্পনা করা হলেও, সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া মব লিনচিংয়ের ঘটনা দেখে উদ্বুদ্ধ হয় তারা। ধারণা ছিল— প্রকাশ্যে হামলা চালালে এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকলে অপরাধ আড়াল করা যাবে। সেই কৌশলেই সোহাগকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়।

সাতটি বাইকে ১৯ জনের হামলা

তদন্তে জানা গেছে, রজনী বোস লেন থেকে সাতটি মোটরসাইকেলে মোট ১৯ জন আসে। তারা সোহাগকে দোকান থেকে ধরে এনে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে, পিটিয়ে ও ভারী কংক্রিট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। এরপর মরদেহ টেনেহিঁচড়ে গেটের বাইরে এনে উল্লাস করে।

ব্যক্তিগত প্রতিশোধও ছিল

তদন্তে আরও জানা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল। তাদের একজন সোহাগের হাতে আগেই মার খেয়েছিলেন, যার চিহ্ন ছিল কপালে। সেই ক্ষোভ থেকেই তারা হামলায় সক্রিয় অংশ নেন।

অনেককেই ঘটনাস্থলে ‘গ্যাঞ্জাম’ হচ্ছে বলে ডেকে আনা হয়েছিল। পরে মাহিন বলেন, ‘ও বেঁচে থাকলে আমরা সবাই শেষ’। তখনই একযোগে সোহাগের ওপর আক্রমণ চালানো হয়।

রবিনের স্বীকারোক্তি

গ্রেফতার আসামি তারেক রহমান রবিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, অস্ত্রটি তিনি ছোট মনিরের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের পর তা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।

আরও গ্রেফতার, রিমান্ড

সোহাগ হত্যাকাণ্ডে সম্প্রতি নেত্রকোণা থেকে দুই ভাই—সজীব ব্যাপারী ও রাজীব ব্যাপারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালত আলমগীর ও ‘লম্বা মনির’-এর চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এর আগে মাহিন, টিটন ও রবিনের রিমান্ড হয়েছে।

এলাকাজুড়ে এখনও আতঙ্ক

ঘটনার পর ভাঙারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকের ধারণা, মাহিন গ্রেফতার হলেও তার অনুসারীরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। গতকাল বিকালে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়িও আসতে দেখা গেছে।

বিচারিক তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট

এ হত্যাকাণ্ডের বিচারিক তদন্ত ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। রিটে নিহতের পরিবারের ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার আবেদন জানানো হয়েছে।

আনসার বাহিনীর ব্যাখ্যা: ‘রোস্টারে দায়িত্ব ছিল না’

অন্যদিকে, আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক  মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ দাবি করেছেন, এ ঘটনায় তাদের সদস্যদের কোনও গাফিলতি ছিল না। কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনার সময় ৩ নম্বর গেটে তাদের দায়িত্ব দেয়নি।

রবিবার (১৩ জুলাই) বিকালে আনসার বাহিনীর খিলগাঁও সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সময় আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময়সীমা ও অবস্থান ছিল রোস্টার অনুযায়ী সীমাবদ্ধ। মিটফোর্ড ৩ নম্বর গেট এলাকায় বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। অথচ সেখানে দুপুর ২টার পর কোনও আনসার সদস্যের দায়িত্ব ছিল না।’

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
শিশু রামিসা হত্যা মামলানতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
সর্বশেষ খবর
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি