‘বিয়ের দুই বছরের মাথায় আমার স্বামী নিলয়কে হত্যা করা হয়। তার রেখে যাওয়া সমস্ত স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছি। তার পছন্দের সব কিছুই যত্নে রেখেছি। জানি না, মৃত্যুর আগে স্বামী হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো কিনা? তবুও আশায় আছি। বিচারের অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কবে নাগাদ হবে জানি না। আদৌ কি বিচার হবে?’ এভাবে স্বামী হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কার কথা জানালেন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের স্ত্রী আশামণি।
২০১৫ সালের ৭ আগস্ট আশামণির স্বামীকে রাজধানীর পূর্ব গোড়ান টেম্পো স্ট্যান্ডের কাছে আট নম্বর সড়কে নিজ বাসায় হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আশামণি অজ্ঞাতপরিচয় চার জনকে আসামি করে রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাক্ষীরা ঠিক মতো না আসায় বিচারে দেরি হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক শাহ মো. আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস ১৩ জনকে আসামি করে চার্জশিট জমা দেন। এরপর ১৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন বিচার শুরুর আদেশ দেন তৎকালীন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ফয়সল আতিক বিন কাদেরের আদালত।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. ইব্রাহিম মিয়ার আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। চার্জশিটভুক্ত ১৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই পুলিশ পরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন সাক্ষ্য দেন। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেন। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করে আদালত।
বিচারে বিলম্বের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ বিল্লাহ হোসেন বলেন, যেকোনও মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেন সাক্ষীরা। এ মামলায় সাক্ষীরা ঠিকমতো আদালতে না আসার কারণে বিচার শেষ করতে দেরি হচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রপক্ষে আসার পর চার জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছি। যে সকল সাক্ষী আদালতের সমন পেয়েও আসছেন না তাদের জন্য আদালত থেকে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আশা করি, খুব শিগগিরই মামলাটির বিচারকার্য শেষ করতে পারবো।
সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপার এই পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, আমার মনে হয় সাক্ষীরা ভয় পাচ্ছেন। কোনও না কোনভাবেই তারা বায়াস হয়ে যাচ্ছে। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দেওয়ার সময়ে সাক্ষীরা বলছেন, মনে নেই, ভুলে গেছি। অথচ তারা কাঠগড়ায় ওঠার আগে সব জানার কথা স্বীকার করেছেন। চার্জশিটভুক্ত ১৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। আরও কয়েকজনের সাক্ষ্য নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এরপর ডাক্তার এবং ফরেনসিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য নিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করা হবে। আশা করি, সত্যটা উদ্ঘাটন হবে। ভিকটিমের পরিবার ন্যায় বিচার পাবেন।
আসামিদের পক্ষের আইনজীবী আবু বক্কর সিদ্দিক, তরিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান জানান, আমরাও চাই মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হোক। আমাদের মক্কেলরা দীর্ঘদিন কারাগারে আছেন৷ বিচারে বিলম্ব হওয়ায় সত্য-মিথ্যা জানা যাচ্ছে না। তবে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে থাকা কোনও মামলার বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আশা করি, আসামিরা এই মামলায় ন্যায়বিচার পাবেন।
স্বামী হত্যার বিচারের বিষয়ে আশামণি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এতদিন হয়ে গেলো এখনও মামলার বিচার শেষ হলো না। নতুন করে আর কী চাইবো। এখনও নিলয় হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছি। মামলার বিচার হোক, কাঙ্খিত একটা বিচার হোক। তাকে কেন হত্যা করা হলো, অন্য কোনও শাস্তিও তো দিতে পারতো। কিন্তু বিনা অপরাধে তরতাজা মানুষটাকে কেমনে তারা হত্যা করলো? তাকে হত্যা করার যৌক্তিক কোনও কারণ আমি দেখি না। এই দিন এলে অনেকেই যোগাযোগ করে। পরে আবারও তারা ভুলে যান।
মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন— মেজর জিয়া, মো. মাসুম রানা, সাদ আল নাহিয়ান, মো. কাওসার হোসেন খাঁন, মো. কামাল হোসেন সরদার, মাওলানা মুফতী আব্দুল গাফ্ফার, মো. মর্তুজা ফয়সলে সাব্বির, মো. তারেকুল আলম ওরফে তারেক, খায়রুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে রিফাত ওরফে ফাহিম ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাহাব, মোজাম্মেল হোসেন সায়মন, মো. আরাফাত রহমান ও মো. শেখ আব্দুল্লাহ ওরফে জুবায়ের। আসামিদের মধ্যে মেজর জিয়া ও সাদ আল নাহিয়ান পলাতক রয়েছে। গত বছর নভেম্বর মাসে আবু সিদ্দিক সোহেল আদালত থেকে পালিয়ে গেছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব গোড়ান টেম্পোস্ট্যান্ডের কাছে আট নম্বর সড়কে নিজ বাসায় খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়। চার যুবক বাসা ভাড়ার কথা বলে নিলয়ের বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী আশামণি ও এক শ্যালিকাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। অস্ত্রের মুখে তাদের বারান্দায় আটকে রাখা হয়েছিল। এরপর নিলয়ের গলা ও ঘাড়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় আশামণি অজ্ঞাতপরিচয় চার জনকে আসামি করে রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
২৭ বছর বয়সী নিলয় রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেকটিভ নামে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন। ব্লগে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ঘটনার আগে কিছুদিন ধরে হুমকি পাওয়ার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে হত্যার আড়াই মাস আগে নিলয় জিডি করতে গেলেও থানা তা নেয়নি বলে ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লিখে গেছেন।









