মৎস্য খাতকে টেকসই করতে পরিবেশসম্মত কৃষির চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট  
২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:২০আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:২০

দেশীয় মাছের বিলুপ্তি রোধে অনেকগুলো নতুন জলাশয়কে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেছেন, ‘খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নীতিগতভাবে মৎস্য ও প্রাণিখাতকে কৃষির চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভর্তুকির কিছুটা ব্যবস্থা এবার করা হয়েছে। দেশে প্রাণিজ মাংসের বেশিরভাগটাই আসে স্থানীয় গৃহস্থ বা খামারিদের কাছ থেকে। নতুন ৪০ হাজার কার্ডধারী নারী মৎস্যজীবী এবার যুক্ত হয়েছেন। মৎস্যনীতি দ্রুতই চূড়ান্ত করা হবে।’

সোমবার (২৪ নভেম্বর) বিকালে ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এক পলিসি ডায়ালগে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের মৌলিক নীতিমালা: বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ’ শীর্ষক এই পলিসি ডায়লগের আয়োজন করে এগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশ, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জার্মানভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফে-ডব্লিউএইচএইচ, ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও এফআইভিডিবি।

পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ডায়ালগে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. শি জিয়াওকুন  ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন এগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।

গবেষণার আলোকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের গবেষণা পরিচালক আহমেদ বোরহান এবং সঞ্চালনা করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা।

আরও বক্তব্য রাখেন সিআইআরডিএপি’র গবেষণা পরিচালক ড. গঙ্গা ডি আচার্য, হেইফার ইন্টারন্যাশনালের দেশীয় পরিচালক নুরুন নাহার, এফআইভিডিবি’র নির্বাহী পরিচালক বজলে মোস্তফা রাজী, এনএসএসের নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না, ডাসকো ফাউন্ডেশনের সিইও মো. আকরামুল হক, বাস্তবের নির্বাহী পরিচালক রুহী দাস, বিসেফ ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান মিটন, ডব্লিউএইচএইচের হেড অব প্রজেক্ট মো. মামুনুর রশীদ প্রমুখ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার তার বক্তব্যে বলেন, ‘এখনও প্রাণিজ মাংসের বেশিরভাগটাই আসে দেশিয় ক্ষুদ্র চাষি, গৃহস্থ বা খামারিদের কাছ থেকে। দেশীয় মাছের বেশকিছু জাত বিলুপ্ত হওয়া ঠেকাতে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো আমাদের রক্ষা করতে হবে। সেখানে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও আমাদের নজর দিতে হবে। অনেকগুলো নতুন জলাশয়কে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। বাওরে যতটা পারা গেছে, হাওড় এলাকায় এখনও পারা যায়নি অতটা। আমাদের দায়িত্বহীন পর্যটনের অনুশীলন এজন্য অনেকটা দায়ী। এসব বিষয়ে পর্যটন নীতিতেও নজর দেওয়া দরকার।’

তিনি বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নীতিগতভাবে মৎস্য ও প্রাণিখাতকে কৃষির চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন এখানেও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভর্তুকির প্রয়োজন, যার কিছুটা ব্যবস্থা এখন করা হয়েছে। নারী মৎস্যজীবীদের কার্ড দেওয়া হলে তাদের নিয়মিত পাওয়া যাবে বিভিন্ন কাজে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে নতুন ৪০ হাজার কার্ডধারী নারী যুক্ত হয়েছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গরমের কারণে মাছ মরে গিয়ে পুকুরে ভেসে ওঠে। এজন্য আমাদের কাজ করতে হবে। মৎস্য নীতি আমরা চূড়ান্ত করবো দ্রুতই। জলাশয়ের ক্ষুদ্র মাছচাষীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। চলনবিল অঞ্চলে শুধু মাছ নয়, অনেক বাথানও রয়েছে। সেগুলোও আজ বিপদাপন্ন। কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক মৎস্য ও প্রাণবৈচিত্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। সেজন্য কীটনাশকের বিষয়টি শুধু কৃষির বিষয় হিসেবে না রেখে মৎস্য নীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট করা দরকার।’

সভাপতি মো. ফজলুল কাদের তার বক্তব্যে বলেন, ‘উন্মুক্ত জলাশয় ছাড়া সবকিছুকেই কৃষি হিসেবে পরিগণিত করা হয়। তাই একটি সমন্বিত কৃষিনীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।’

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, ‘মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সকল পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রাণিসম্পদে অবদান রাখা ক্ষুদ্র খামারিরা হারিয়ে যাচ্ছে। পোল্ট্রি এখন একটি শিল্প। দেশের বাইরে রফতানির জন্য শিল্প ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য ক্ষুদ্রচাষীদের গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষিতে নতুন জাত উৎপাদনে গেলে নতুন নতুন রোগও তৈরি হয়। সেটা নিয়ে কাজ করছি আমরা। প্রাণিসম্পদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের যোগান দিতে হবে। তাহলেই গ্রামীণ অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. শি জিয়াওকুন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা যে থ্রি জিরো ভিশনের উল্লেখ করেন তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য সংরক্ষণ বিষয়ক আরও গবেষণা দরকার। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। এ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দক্ষতা উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা দরকার। এনজিওদের এ ক্ষেত্রে অবদান জোরদার করতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।’

কোয়ালিশনের আহ্বায়ক মহসীন আলী তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘একটি খাদ্য সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। এতে পরিবেশসম্মত কৃষিকে ত্বরান্বিত করতে কৃষক-কিষাণীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ একত্রিত হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে কৃষি সংশ্লিষ্ট নীতি-আইন পর্যালোচনা, সুপারিশ নিয়ে পলিসি এডভোকেসি, আন্তর্জাতিকভাবে সাউথ-সাউথ সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করা আমাদের উদ্দেশ্য। আমাদের শিক্ষিত তরুণরা এখন কৃষিকাজে এগিয়ে আসছে এবং আশার কথা হচ্ছে এ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

তিনি ক্ষুদ্র ও মৎস্য চাষিদের স্বীকৃতি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের সংগঠনগুলোকে নিবন্ধনে সহায়তা করার আহ্বান জানান।

উপস্থাপিত প্রবন্ধে আহমেদ বোরহান বলেন, ‘দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল যার একটি বড়ো অংশ গ্রামীণ নারী। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫২% এবং প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৪৭%। এ দুই খাতে জনস্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি পর্যালোচনায় দেখা যায়- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে এন্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার; পোলট্রি খাতে ৯০ শতাংশের বেশি খামারে নির্বিচারে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়; খাদ্যে ভারী ধাতু, নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ওজন বর্ধক স্টেরয়েডের উপস্থিতি; বাংলাদেশের মৎস্য খাত থেকে বছরে প্রায় ৩.৬৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয় এবং যার ৯৬% আসে পুকুরে মাছ চাষ থেকে; প্রাণিসম্পদ খাত থেকে ৬-৮ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ঘটে। বাংলাদেশে মোট স্বাদু পানির মাছের ২৫৩টি প্রজাতি থেকে ৬৪টি প্রজাতিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; স্বাধীনতার পর থেকে পরবর্তী চার দশকে সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি ৪৭৫ থেকে কমে ৩৯৪ এ এসে দাঁড়িয়েছে।’

বিদ্যমান নীতিসমূহের মধ্যে অসঙ্গতি ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক কয়েকটি মৌলিক নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যা টেকসই রূপান্তরের পথে অন্তরায়। উচ্চমূল্যের রফতানিযোগ্য মাছের ওপর গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ দেশীয় ছোটো মাছ উপেক্ষিত হয়েছে যা দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া, চিংড়ি চাষের প্রসারের ফলে বহু জায়গায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জমি দখল করে ঘের তৈরি হয়েছে যা বিদ্যমান নীতিতে বর্ণিত দারিদ্র্য বিমোচনের পরিবর্তে বহু মানুষকে ভূমিহীন করেছে। ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০’ (১৯৯৫ সালে সংশোধিত) এর সংরক্ষণমূলক দর্শনের সঙ্গে ‘জাতীয় মৎস্য নীতি ১৯৯৮’এর উৎপাদন-নির্ভর দর্শনের একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে।’

/আইএ/এমএইচআর/
সম্পর্কিত
নবম ওয়েজ বোর্ড হলেও সেটি কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি: তথ্য উপদেষ্টা
সাগর-রুনি হত্যা: সাংস্কৃতিক কর্মীর নাম নিয়ে অনুমান না করার আহ্বান তথ্য উপদেষ্টার
সবজিতে স্বস্তি, মাছ-মাংস-ডিমের দাম আগের মতোই 
সর্বশেষ খবর
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা আজ, অংশ নেবেন তারেক রহমান
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা আজ, অংশ নেবেন তারেক রহমান
চাইনিজ তাইপেকে ৭ গোলে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ 
চাইনিজ তাইপেকে ৭ গোলে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ 
জামায়াত ঘোষিত লংমার্চে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ নাই: রাশেদ খাঁন
জামায়াত ঘোষিত লংমার্চে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ নাই: রাশেদ খাঁন
ভাড়া নেওয়ার পর বন্ধ থাকতো দরজা-জানালা, সেই ঘর থেকে ৩ লাশ উদ্ধার
ভাড়া নেওয়ার পর বন্ধ থাকতো দরজা-জানালা, সেই ঘর থেকে ৩ লাশ উদ্ধার
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ