ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানার দুই মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক এবং ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। এতে শেখ হাসিনার পাঁচ বছর করে ১০ বছর, টিউলিপ সিদ্দিকের দুই বছর করে চার বছর এবং দুই মামলায় মূল আসামি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনাকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে মামলায় একমাত্র আত্মসমর্পণকারী রাজউকের সদস্য খুরশীদ আলমকে এক বছর করে মোট দুই বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি দুই মামলায় বাকি সব আসামিকে পাঁচ বছর করে ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুই মামলায় প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড ঘোষণা করেন আদালত।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলমের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর তরিকুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মইনুল হাসান লিপন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
রায় শেষে তারা মিডিয়াকে বলেন, রায়ে আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছি। তবে আদালত তার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের সন্তুষ্টির বিষয়ে তারা বলেন, এ বিষয়ে দুদক সিদ্ধান্ত নেবে।
আজ সোয়া ১২টার দিকে বিচারক আদালতে উঠে সংক্ষিপ্তভাবে রায় পড়েন। বিচারক বলেন, দুইটা মামলার অভিযোগ একইরকম। দুই মামলায় শেখ হাসিনাসহ টিউলিপ আসামি আছেন। এ জন্য বিস্তারিত বলার দরকার নেই বলে মনে করছি। কারণ এর আগেও এ ধরনের চারটি মামলার রায় হয়েছে। মামলার আসামিরা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক তাদের বিচারে বাঁধা নেই। শুধু খুরশীদ আলম উপস্থিত হয়েছেন। বাংলাদেশ গেজেটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরও বাকিরা হাজির হননি। তারা পলাতক আছেন। তাই বলার কোনও কারণ নেই যে তাদের আদালতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পাননি। পরে আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রায় ঘোষণা করেন।
এদিন সকালে আদালতে আনা হয় একমাত্র আত্মসমর্পণ আত্মসমর্পণকারী আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলমকে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৩ জানুয়ারি আজমিনা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া। ওই মামলায় টিউলিপ ও শেখ হাসিনাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
অন্যদিকে, একই দিনে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এসএম রাশেদুল হাসান। এই মামলায়ও শেখ হাসিনা ও টিউলিপসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
মামলার উল্লেখযোগ্য অন্য আসামিরা হলেন– সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের পিএ মো. আনিছুর রহমান মিঞা এবং রাজউকের সাবেক পরিচালক শেখ শাহিনুল ইসলামসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জানুয়ারি আজমিনা সিদ্দিকের এবং ১৮ জানুয়ারি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়। এরপর আদালত রায় ঘোষণার জন্য ২ ফেব্রুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকার তথ্য গোপন করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তায় ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। শেখ হাসিনা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করেছেন এবং আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। এতে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে পূর্বাচল প্লট দুর্নীতির পৃথক চার মামলায় শেখ হাসিনাকে মোট ২৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি অন্যান্য আসামিদেরও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।









