বিমানবন্দরের নতুন ইজারা নীতিমালা নিয়ে চলছে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের মধ্যে রশি টানাটানি। মন্ত্রণালয়ের এ বিধিমালা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে বেবিচকের আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে নতুন ইজারা নীতিমালা প্রায় চূড়ান্ত করে তিন দিনের মধ্যে মতামত চায় মন্ত্রণালয়। এরই প্রেক্ষিতে বিধিমালার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বেবিচক চিঠিও দেয়। তবে সেই চিঠির তোয়াক্কা না করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে খসড়া আবারও পাঠানো হয়েছে বেবিচকে। বেবিচক চেয়ারম্যান আবারও আপত্তি জানিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি মন্তণালয়কে চিঠি লিখেছেন।
এদিকে নতুন করে বর্তমান ব্যবসায়ীদের পক্ষে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ব্যারিস্টার রাজিন আহমেদ।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় নীতিমালা তৈরি করছে। আগেও নীতিমালার ভিত্তিতে ইজারা হতো। নতুন নীতিমালাতে আমরা কিছু আপত্তি দিয়ে কীভাবে সেটি সমাধান হবে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বাকিটা মন্ত্রণালয়ের হাতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের সম্পত্তি ইজারা নীতিমালা ও ইজারা প্রদান কার্যক্রম স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। মূলত এরপর থেকে শুরু হয় রশি টানাটানি।
মন্ত্রণালয় বিদ্যমান ইজারা নীতিমালা পরিবর্তন করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নে তোড়জোর শুরু করে। এরইমধ্যে মধ্য গত ১৮ জানুয়ারি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে মাত্র তিনদিনের মধ্যে মতামত চেয়ে বেবিচককে চিঠি দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে নীতিমালার কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।
এরপর আবারও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘বেবিচকের আওতাধীন স্থাবর সম্পত্তি ইজারা বিধিমালা, ২০২৬’ চূড়ান্ত খসড়া পাঠানো হয় বেবিচকে। খসড়া পাওয়ার পর এবারও বেবিচকের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।
ওই খসড়া প্রস্তাবিত বিধিমালাটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্তৃত, যা বিমানবন্দর পরিচালনা, এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড কার্যক্রম, যাত্রীসেবা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রচলিত প্রশাসনিক অনুশীলন অনুযায়ী, এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কারিগরি শাখা, ইউনিট ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন চেয়ারম্যান।
বেবিচকের মতে, বিমানবন্দর পরিচালনা কিংবা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কোনো বিধিমালা যদি আইকাওর আন্তর্জাতিক মান ও সংশ্লিষ্ট এনেক্সের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অডিটে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। প্রস্তাবিত ইজারা বিধিমালার কয়েকটি ধারা সে ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনগত দিক থেকেও খসড়া বিধিমালাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে বেবিচক। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১৭ অনুযায়ী বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটির সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব বেবিচকের ওপর ন্যস্ত। অথচ প্রস্তাবিত বিধিমালায় সেই এখতিয়ারে সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত রয়েছে, যা একদিকে বেবিচক আইন, ২০১৭ এবং অপরদিকে সংশোধিত বেসামরিক বিমান চলাচল অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বেবিচক তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ সালের আগে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক ইজারা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অপারেশনালভাবে অকার্যকর। ওই সময় একাধিক প্রশাসনিক সংকট ও অডিট আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। পরবর্তীতে যাত্রীসেবা সহজকরণ ও বিমানবন্দর পরিচালনা গতিশীল করতে ইজারা নীতিমালার সংস্কার করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালার কিছু ধারা সেই পুরোনো জটিল ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে— যা আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব বিমান চলাচল ব্যবস্থার পরিপন্থি বলে মত দিয়েছে বেবিচক।
খসড়া বিধিমালায় ইজারা প্রদান ও মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়েছে এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড কার্যক্রম সরাসরি আইকাওর নিরাপত্তা মান ও অপারেশনাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। পর্যাপ্ত কারিগরি ও অপারেশনাল জ্ঞান ছাড়া গঠিত কোনো কমিটি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যার প্রভাব পড়তে পারে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান রক্ষার ওপর। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় এয়ারসাইড এলাকায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রদান অনুচিত বলেও মত দিয়েছে বেবিচক। এতে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যার শেষ পর্যন্ত আর্থিক চাপ বহন করতে হবে যাত্রীদের এবং তা আইকাও এনেক্স-৯ এর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
চিঠিতে বেবিচক আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সময় প্রদান করা হলে তারা সংশ্লিষ্ট সব শাখা, ইউনিট ও অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসঙ্গত ও তথ্যভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক মতামত মন্ত্রণালয়ে দিতে সক্ষম হবে। অন্যথায় তাড়াহুড়ো করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক অডিট ও মূল্যায়নে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, একটি কমিটি গঠন করে এই বিধিমালাটি তৈরি করা হয়েছে। বেবিচক কিছু বিষয়ে আপত্তি দিয়েছে। কমিটি মনে করলে সেটি আলোচনায় নেবে, আর প্রয়োজন মনে না করলে বিধিমালাটি চূড়ান্ত হবে।
অপরদিকে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজিন আহমেদ ৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ব্যবসায়ীদের পক্ষে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছে। এখানে এই বিধিমালার যৌক্তিকতা ও আইনীভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আগামী সাত দিনের মধ্যে আইনি নোটিশের জবাব না পেলে উচ্চ আদালতে মামলা করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে পাঁচ শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে, যা খসড়া বিধিমালার গুরুত্ব এবং নাগরিক ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রত্যাশা স্পষ্ট করে।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের রুলস অব বিজনেসের অনুচ্ছেদ ৩১ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর অনুচ্ছেদ ২৪০ অনুযায়ী জনমত আহ্বান কোনো আনুষ্ঠানিক বা দায়সারা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়াগত শর্ত। অত্যন্ত স্বল্প সময়সীমা, পৃথক ও সুস্পষ্ট নোটিশের অভাব এবং মতামত দাখিলের স্পষ্ট প্রক্রিয়া না থাকলে জনমত গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে মামলা হবে বলে তিনি জানান।








