একসময় যাদের ঈদ কাটত গণভবনের রাজসিক মিলনমেলায় কিংবা অনুসারীদের ভিড়ে, আজ তাদের ঠিকানা কারাগারের নির্জন কক্ষ। ক্ষমতার দাপট আর আভিজাত্যের জৌলুস কাটিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী আমলারা এখন বিচারের খড়গ মাথায় নিয়ে বন্দিজীবনের ঈদ পালন করছেন। মেন্যুতে পোলাও-রোস্ট থাকলেও, আনিসুল-পলকদের মনে নেই কোনও স্বস্তি।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২ শতাধিক ভিআইপি আসামি গ্রেফতার হয়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, হেভিওয়েট নেতাকর্মীসহ ১৬১ জন কারাগারে ডিভিশন (প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে উন্নত সুযোগ-সুবিধা) পেয়েছেন।
তবে এসব আসামির মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে—এমন ৬০ জনের মতো ভিআইপি আসামিদের ঢাকার কেরানিগঞ্জে বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। তারা সবাই ঈদের দিন একসঙ্গে নামাজ আদায় করার সুযোগ পাবেন। এসময় তারা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করারও সুযোগ পাবেন। ঈদের দিন ও পরের দুই দিন আসামিরা পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মোবাইল ফোনে কথা বলারও সুযোগ পাবেন। তবে ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার স্বার্থে ভিআইপি বন্দিদের আগেই নম্বর জমা দিতে হবে। এছাড়া ঈদের দিন সকল বন্দিদের জন্য বিশেষ খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছে।
কারাবন্দি ভিআইপিদের ঈদের খাবারের বিষয়ে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে থেকে জানা গেছে, ঈদের সকালে পায়েশ-সেমাই, দুপুরে পোলাও, খাসি বা গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট এবং মিষ্টির আয়োজন থাকছে।
কারা অধিদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) জান্নাত-উল ফরহাদ জানান , ঈদের দিন সকালের নাশতায় থাকবে আসামিদের জন্য পায়েশ বা সেমাইয়ের সঙ্গে মুড়ি । দুপুরের খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, সালাদ, মিস্টি, পান এবং সুপারি। অন্য ধর্মাবলম্বী বন্দিদের জন্য গরুর মাংসের পরিবর্তে খাসির মাংস পরিবেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাতের খাবারে বন্দিদের জন্য সাদা ভাত, আলুর দম এবং রুই মাছ ভাজা থাকবে। এছাড়া ঈদের দিন ও পরের দুই ঈদে বাইরে থেকে স্বজনদের আনা খাবারও কারাগারে বসে খেতে পারবেন আসামিরা।
তবে এবারের ঈদে খাবারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বেদনা। কারা সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কারাগারের দিনগুলোতে অধিকাংশ সময় নিশ্চুপ থাকেন। অন্যদিকে, আমির হোসেন আমু বা কামরুল ইসলামের মতো প্রবীণ নেতাদের গ্রাস করেছে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা।
জুনায়েদ আহমেদ পলকের স্ত্রী আরিফা জেসমিন কনিকা বিদেশে থাকায় পলকের আক্ষেপটা সবচেয়ে বেশি। মা-ভাই দেখা করতে এলেও জীবনসঙ্গিনীর অভাব তাকে পোড়াচ্ছে। সালমান এফ রহমানের দুদকের মামলার কারণে বিদেশে থাকা ছেলে শায়ান ফজলুর রহমানসহ পরিবারের অনেকের সঙ্গেই তার সাক্ষাতের সুযোগ নেই। সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম তার মেয়ে বুশরা আফরিনের দেখা পেতে চাইলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এছাড়াও হাজী সেলিম ও সোলাইমান সেলিম বাবা-ছেলে একই সাথে আটক থাকলেও কারাগার ভিন্ন হওয়ায় ঈদের দিনেও তাদের দেখা হওয়ার সুযোগ নেই।
সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-রুপা কাশিমপুর কারাগারে নারী ও পুরুষ ভবন আলাদা হওয়ায় একই প্রাঙ্গণে থেকেও দেখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন।
সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু এবং শ্যামল দত্তের আইনজীবী শ্যামল কান্তি সরকার বলেন, “তাদের পরিবারের সদস্যরা ঈদে কারাগারে দেখা করবেন বলে জানি।”
সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী জানান, ঈদে কেরানিগঞ্জের বিশেষ কারাগারে পলকের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন তার মা, ভাই ও তিন বোন।
আইনজীবী রাখী বলেন, “কারাগারে ভালো খাবারের কথা বলা হলেও স্বাধ বাইরের খাবারের মতো হয় না। অনেকদিন ধরে তারা কারাগারে আটক আছেন। সবাই জামিন পেয়ে দ্রুত মুক্তির অপেক্ষায় আছেন।”
বিশেষ কারাগারে ভিআইপিদের মিলনমেলা
কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে প্রায় ৬০ জন ভিআইপি বন্দী একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের সুযোগ পাবেন। সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু থেকে শুরু করে ব্যারিস্টার সুমন ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের মতো হেভিওয়েটরা সেখানে নামাজ শেষে কুশল বিনিময় করবেন। একসময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একই বন্দিশালায় কাতারে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবেন।









