আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্ত ঝরছে, রাজনৈতিক কোন্দলে বাড়ছে সহিংসতা

সুজন কৈরী
২৩ মার্চ ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৬, ২২:০০

দেশজুড়ে হঠাৎ করে বেড়েছে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা। এসব ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হচ্ছেন অনেকেই। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে। এরপর থেকে এ ধরনের সংঘর্ষের প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক সংঘর্ষে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব সহিংসতার পেছনে কারা কলকাঠি নাড়ছে, কেনই-বা তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। শাস্তির অভাবে জনমনে যেমন আতঙ্ক বাড়ছে, তেমনই তৈরি হচ্ছে নানা সংশয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাই এসব সংঘাতের মূল কারণ। পাশাপাশি দলীয় নতুন ও পুরোনো গ্রুপের দ্বন্দ্বও সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

তারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান এই সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্রিক সংঘর্ষ থেকে শুরু করে যেকোনও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অসহনশীল আচরণের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এখানে কোনও চ্যালেঞ্জের বিষয় নেই। পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে পাবনার সুজানগরের মানিকহাট ইউনিয়নের ভিটবিলা পশ্চিমপাড়া গ্রামে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে চায়না খাতুন (৪০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন অন্তত ১০ জন। একই সময়ে ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ আরও অন্তত ১৫ জন আহত হন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে গুরুতর আহত দুজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন অন্তত ১৫ জন এবং ভাঙচুর করা হয় প্রায় ২০টি বসতঘর। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে ছয়জনকে আটক করেছে।

নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়া বলেন, ‘‘সোহেল কাজী ও হাফিজ ভূঁইয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে বিরোধ আরও বাড়ে। সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষই ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পুলিশ ওই ককটেলগুলোর উৎস খুঁজছে। আর এ ঘটনায় এখনও কোনও পক্ষ মামলা করেনি। তবে ঘটনার পর ছয় জনকে আটক করেছে পুলিশ।’’

এর আগে রবিবার (২২ মার্চ) কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও নাটোরের সিংড়াতেও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ বহু মানুষ আহত হন। সবগুলো ঘটনাই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিবাদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘটিত হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন,  ‘‘রাজনৈতিক কোন্দল নতুন কিছু নয়। তবে পুলিশ সবসময়ই কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।’’

পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িতদের আটক করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। ভবিষ্যতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেকোনও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকবে।’’

কোনও ঘটনা ঘটলে নিকটস্থ থানা বা ৯৯৯ এ জানানোর অনুরোধ জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।’’

এমন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যভস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এখানে চ্যালেঞ্জের কোনও বিষয় নেই। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটিই কঠোরভাবে করা হচ্ছে।’’

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যেকোনও মৃত্যু দুঃখজনক ও কষ্টের। সে দলের হোক অথবা অন্য দলের হোক। এটি যে কোনোভাবে ঠেকাতে হবে। নতুন সরকারের এক মাস গেল। সরকারকে সামনে কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতি পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হাসিনার  সরকার বাংলাদেশকে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থায় রেখে গেছে। তা থেকে উদ্ধার করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই।’’

দলীয় কোন্দলে সংঘাত সহিংসতার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কোথায় কোথায় সংঘর্ষ হয়েছে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারিনি। তবে দলীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ হয়ে থাকলে বিষয়টি নিশ্চয়ই স্থানীয় সংগঠন দেখবে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে তদারকি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই সহিংসতা আমাদের সমাজে সহনশীলতার ঘাটতির প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সহনশীলতা কেবল আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই এটি গড়ে তুলতে হবে।’’

/জেইউ/এমকে/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
থানার ভেতরে আটকে বিএনপি নেতাকে মারলো কারা?
সর্বশেষ খবর
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের