বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
বুধবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দফতরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বিদায়ী সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে নবনিযুক্ত সিআইডি প্রধান বিভাগটিকে আরও গতিশীল, পেশাদার এবং জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সিআইডির অর্জিত সুনাম ও ব্র্যান্ডিং ধরে রাখতে হলে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এককভাবে কোনও প্রধান বা ব্যবস্থাপক সফল হতে পারেন না—প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সদস্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই প্রকৃত সহযোগিতা। সততার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শুধু আর্থিক ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি কাজে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা অনুপস্থিতি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যথাযথ কারণ ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
সদস্যদের উৎসাহ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য সিআইডিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক টুলস রয়েছে। এরপরও কেউ দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী থাকলে তার জন্য সিআইডিতে স্থান নেই বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি জানান, কর্মদক্ষতা সন্তোষজনক না হলে সিআইডির স্বার্থে এবং বাংলাদেশ পুলিশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সিআইডিকে সাধারণ মানুষের কাছে একটি ‘এপেক্স ইনভেস্টিগেশন ইউনিট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
নবাগত সিআইডি প্রধান তার বক্তব্যে বিদায়ী প্রধান ছিবগাত উল্লাহর কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। তার নেতৃত্বে সিআইডির দৃশ্যমান অগ্রগতি ও ব্র্যান্ডিং ভবিষ্যতেও ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিদায়ী প্রধান বর্তমানে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সেখান থেকেও সিআইডির কার্যক্রমে দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে তিনি বিদায়ী প্রধানের গৃহীত উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অসমাপ্ত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রধানকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
বিদায়ী সিআইডি প্রধান ছিবগাত উল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, তিনি মোট ৩১৩ দিন সিআইডিতে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এই সময়ে একটি দক্ষ, সমন্বিত ও প্রতিশ্রুতিশীল টিম গড়ে তোলাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সিআইডি শুধু একটি সংস্থা নয়, এটি একটি পরিবার—যেখানে সবাই আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দলগতভাবে কাজ করে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রায় ৬০০টি মামলা পেন্ডিং ছিল, যা কমিয়ে প্রায় ৫০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মানিলন্ডারিং ও ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমসংক্রান্ত জটিল মামলাগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে।
তদন্ত কার্যক্রমে ক্রাইম সিন প্রটেকশন ও প্রাথমিক পর্যায়ে ফিজিক্যাল এভিডেন্স সংগ্রহের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘ক্রাইম সিন সুরক্ষা তদন্তের মূল ভিত্তি।’
তিনি আরও জানান, সিআইডিতে মেডিকেল সেন্টার স্থাপন, আধুনিক তদন্ত সহায়ক টুলস ও সফটওয়্যার সংযোজন এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফরেনসিক ও এভিডেন্স-ভিত্তিক তদন্ত জোরদারে ছয়টি রিজিওনাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মেট্রোপলিটনসহ ৬৪ জেলায় ৭৪টি ক্রাইম সিন ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন।
তিনি জানান, একটি ‘ওয়ান স্টপ কল সেন্টার’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ থেকে সমাধান পর্যন্ত সমন্বিত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিদায়ী প্রধান নবাগত প্রধানকে এসব উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং সিআইডিকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর জোর দেন। তিনি কর্মকর্তাদের ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও জানান, তার দায়িত্বকালে প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
নবাগত প্রধানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বে সিআইডি আরও এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তিনি সকল সদস্যকে নতুন নেতৃত্বকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। সিআইডি প্রধান হিসেবে যোগদানের আগে তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন ডিরেক্টরেটে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এবং কুষ্টিয়া, ভোলা, শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতিসংঘ মিশনেও কাজ করেছেন।









