২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় পুলিশের গুলিতে ট্রাকচালক সুজন (২৫) নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। তদন্তে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদেরদের ‘হুকুমে, নির্দেশে, পরিকল্পনায় ও উসকানিমূলক বক্তব্যে’ দেশজুড়ে শিক্ষার্থী নিধনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। আর তা বাস্তবায়ন করেছিলেন তারিকুজ্জামান রাজিব, আসিফ আহম্মেদ সরকার, সলিমউল্লাহ সলুরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক শংকর কুমার ঘোষ গত ১১ মার্চ এই অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেন। তবে এজাহারনামীয় ৪৭ জনসহ অজ্ঞাতনামা প্রায় ৪৫০-৫০০ জনের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আগামী ৮ এপ্রিল মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
অভিযোগপত্রভূক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, সাবেক কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজিব, আসিফ আহম্মেদ সরকার ও সলিমউল্লাহ সলু।
অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— মাহবুবুল আলম, আলম হোসেন, আরিফ, ফাহিম খান, রিয়াজ মাহমুদ, নজরুল ইসলাম, পীযূষ বাবু, মাসুদ ওরফে কালা মাসুদ, দেলোয়ার, বশির মোল্লা।
তদন্ত কর্মকর্তা শংকর কুমার ঘোষ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ জুন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ সম্বোধন করেন। এতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিলে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল পান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনিছুল হক, সাদেক খান, মোহাম্মদ এ আরাফাতের হুকুমে, নির্দেশে, পরিকল্পনায় ও উসকানিতে তা দমনে ‘নিধন ঘোষণা’ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ জুলাই রাত ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের বছিলায় শান্তপূর্ণ মিছিলে হামলা ও গুলিবর্ষণ করে তারিকুজ্জামান রাজীব, আসিফ আহমেদসহ অন্যরা।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, পেশায় ট্রাকচালক সুজন সেদিন সন্ধ্যায় তার ট্রাকটি বেড়িবাঁধ সংলগ্ন লাওতলা পার্কিংয়ে রাখতে গিয়ে বছিলা তিন রাস্তার মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় ওই রাতেই ১৫ হাজার টাকায় পিকআপ ভাড়া করে সুজনের মরদেহ ভোলার বোরহানউদ্দিন বোরহানউদ্দিন থানাধীন সাচড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে রামকেশব গ্রামের জালাল হাওলাদার বাড়ির জামে মসজিদের পেছনে দাফন করা হয়।
সুজনের মৃত্যুর সময় তার ছেলে শুভর বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। এখন চার বছর বয়সী শুভকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন সুজনের ভাই রফিকুল ইসলাম।
আখের রস বিক্রি করে সংসার চালানো রফিকুল বলেন, “ভাইকে তো আর ফিরে পাবো না, কিন্তু খুনিদের বিচার চাই। শুভ মাঝে মাঝে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে আমরা একথা-ওকথা আর আদর-ভালোবাসা দিয়ে ভুলিয়ে রাখি।”
চাক্ষুষ সাক্ষী চা দোকানদার মো. নিজাম জানান, আন্দোলনের সময় তারা এক সঙ্গেই ছিলেন। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের ধাওয়ায় দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং পরে সুজনের মৃত্যুর খবর পান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ৭৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪৫০-৫০০ জনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেছিলেন নিহতের ভাই রফিকুল ইসলাম। দীর্ঘ তদন্ত শেষে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট এই চার্জশিট জমা দিলো।









