“আমি ১০ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাই। তেলের জন্য এত কষ্ট আমাকে জীবনেও করতে হয়নি। রাত জেগে পাম্পে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তবু তেল পাইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে হচ্ছে। সরকার বলছে তেলের সংকট নাই, অথচ সব পাম্পেই দীর্ঘ লাইন। তীব্র গরমে জীবন বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কবে এই ভোগান্তির অবসান হবে আল্লাহ জানেন।”
কথাগুলো বলছিলেন সজীব আহমেদ। বয়স ২৮, পেশায় বাইকার। মতিঝিলের মেঘনা পেট্রোল পাম্পের তপ্ত রোদে দীর্ঘ লাইনে চার ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও তার চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। চার দিন আগে বিজয় সরণি এলাকায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছিলেন তিনি। আজ তাই পাম্পে তেল আসার আগেই সিরিয়াল দিয়েছেন, যদি ভাগ্য সহায় হয়।
সজীবের এই আর্তনাদ আজ রাজধানীর হাজার হাজার বাইকার ও গাড়িচালকের অভিন্ন প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকা। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ছুটির দিনেও পাম্পগুলোতে ছিল না স্বস্তি; বরং ভোর থেকেই জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার আরও তীব্র হয়েছে।
সরেজমিন চিত্র: পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’
সকালে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পেই ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। তবু শত শত বাইকার এই আশায় লাইন ধরে আছেন যে হয়তো দুপুরের পর ডিপো থেকে গাড়ি আসবে। নীলক্ষেত মোড়ের ‘পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশন’ থেকে শুরু করে মগবাজারের ‘মঈন মোটর ফিলিং স্টেশন’ কিংবা রমনার পাম্পগুলো—সবখানেই যানবাহনের সারি মাইলের পর মাইল ছাড়িয়েছে।
আরেক বাইকার রাহাত মিনহাজ (২৬) শোনালেন তার তিক্ত অভিজ্ঞতা। গত সপ্তাহে ১৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে এক পাম্প থেকে তেল পেয়েছিলেন তিনি। রাহাত বলেন, “এখন আর আগের মতো বাইক চালাই না। একেবারে জরুরি না হলে বাইক বের করি না। আজ অলরেডি সাড়ে তিন ঘণ্টা হলো লাইনে দাঁড়িয়েছি। জানি না কখন তেল নিয়ে বাসায় ফিরতে পারব।”
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা: ‘ভিআইপি’ বিড়ম্বনা
সংকটের এই চরম মুহূর্তে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালছে ‘ভিআইপি’ সংস্কৃতি। সাধারণ গ্রাহকরা যেখানে ১০-১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘামছেন, সেখানে প্রভাবশালী পরিচয় বা প্রশাসনের দোহাই দিয়ে অনেকে মুহূর্তেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন।
মগবাজারের মঈন মোটর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা রাব্বি নামের একজন বাইকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ১০-১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাই না। অথচ অনেকে ক্ষমতা দেখিয়ে লাইনে না দাঁড়িয়েই তেল নিয়ে যায়। অনেকে আবার পাম্পের কর্মীদের ১০০-২০০ টাকা বাড়তি দিয়ে ‘সিস্টেমে’ তেল নিচ্ছে। এতে আমাদের অপেক্ষার প্রহর আরও বাড়ছে।” এসব বৈষম্য নিয়ে পাম্প কর্মীদের সঙ্গে সাধারণ চালকদের প্রায়ই হাতাহাতি ও হট্টগোলে জড়াতে দেখা যাচ্ছে।
পাম্প মালিকদের বক্তব্য
পেট্রোল পাম্প মালিকদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। ডিপো থেকে তেল আসতে দেরি হওয়ায় তারা অসহায়। তবে তারা এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসাধু চক্রের কারসাজি এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে তেল মজুত করার প্রবণতা। সঠিক তদারকি ছাড়া এই সংকট মেটানো অসম্ভব বলে মনে করেন তারা।
রাজধানীর এই জ্বালানি অস্থিরতা কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একদিকে তপ্ত রোদ, অন্যদিকে তেলের জন্য অন্তহীন অপেক্ষা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। সজীব বা রাহাতের মতো হাজারো চালকের এখন একটাই প্রশ্ন— কবে শেষ হবে এই তেলের ‘লাইনের’ জীবন?








